২০২০ সালের ক্ষেত্রে বড় বিষয় ছিল কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি

বছর শেষে সালতামামি আমাদের সুযোগ দেয়, বছরজুড়ে বড় আকারে কী ঘটেছে, তা স্মরণ করার এবং তার প্রভাব ভবিষ্যতে কী হবে, তা অনুমান করার। ২০২০ সালের ক্ষেত্রে বড় বিষয় ছিল কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি। এর প্রভাব বৈশ্বিক-আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যতটা পরিবর্তন অনুমান করা হয়েছিল, তা ঘটেনি। কিন্তু দেশে দেশে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়েছে। এর বাইরেও অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সংগত কারণে সেগুলোকে ছাপিয়ে গেছে মহামারি।

দেশে দেশে কোভিডের অন্যতম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে মহামারিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নাগরিক অধিকার সংকোচনের চেষ্টা। প্রায় ১৪ বছর ধরে সারা পৃথিবীতে গণতন্ত্রের ভাটার টান চলছে, তাই সেদিক দিয়ে গণতন্ত্রের সংকোচন করোনাভাইরাসের কারণে নয়। করোনাভাইরাসের সূচনায় জরুরি অবস্থা পরিস্থিতির সুযোগে আরও অনেক দেশ আরও বেশি কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার পথ ধরে। বছর শেষের হিসাব সেই আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করছে না। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নট–ফর–প্রফিট ল (আইসিএনএল)-এর হিসাব অনুযায়ী ৯৬টি দেশে কোনো না কোনো ধরনের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে বা জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ৫০টি দেশে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা মতপ্রকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। ১৩০টি দেশে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যেগুলো সমাবেশ করার ওপরে বাধানিষেধ আরোপ করেছে এবং ৫৩টি দেশে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর আঘাত এসেছে। এসব করা হয়েছে হয় নতুন আইন করে, নতুবা বিরাজমান আইনের কঠোর প্রয়োগের মধ্য দিয়ে।

এসবের এক বড় অংশ করা হয়েছে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক স্বার্থে, জননিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে। অনেক ক্ষেত্রেই তার প্রয়োগ হয়েছে বেছে বেছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকেও এই তথ্যের পক্ষে প্রমাণ মেলে। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডির (সিজিএস) পক্ষ থেকে ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ট্র্যাকার’ বলে তৈরি করা ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই আইনে অভিযুক্ত হয়েছেন ১৫৫ জন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৬ শতাংশ সাংবাদিক, এর বাইরেও এক বড় অংশের আটকের কারণ হচ্ছে সরকারের সমালোচনা করা।

করোনাভাইরাসের অজুহাতে ক্ষমতাসীনেরা যেমন গণতন্ত্রকে সংকুচিত করেছেন, তেমনি মানুষের মধ্যে তা তৈরি করেছে ক্ষোভ-বিক্ষোভ। গত মার্চ থেকে অন্তত ২৬টি দেশে মহামারি মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও মতপ্রকাশের অধিকার সীমিত করার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু মহামারি নিয়ে অসন্তোষই বিক্ষোভের একমাত্র উৎস ছিল না। ২০১৯ সালে যে ধরনের বিক্ষোভ সারা পৃথিবীতে দেখা গিয়েছিল, ২০২০-এর গোড়ায় তা অব্যাহত থাকে। এপ্রিলে তাতে কিছুটা ভাটা দেখা দিলেও বছরের মাঝামাঝি আন্দোলনগুলো আবারও শক্তি সঞ্চয় করেছে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের হিসাব অনুযায়ী, সারা পৃথিবীতে প্রায় ১০০টি সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে, ৩০টি ক্ষেত্রে সরকার বা নেতাদের পতন ঘটেছে, দক্ষিণ আমেরিকার ১২টি দেশের মধ্যে ৮টিতেই বিক্ষোভ হয়েছে।

এসব বিক্ষোভের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বুলগেরিয়া ও ভেনেজুয়েলায় আন্দোলন হয়েছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সুদানে, বেলারুশে ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনী জালিয়াতির বিরুদ্ধে, কিরগিজস্তানে নির্বাচন এবং দুর্নীতির প্রতিবাদে, পেরুতে প্রেসিডেন্টকে ইমপিচমেন্টের বিরুদ্ধে। পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে নাইজেরিয়া ও ফ্রান্সেও গণবিক্ষোভ হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতে একাধিকবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ হয়েছে, এই ডিসেম্বরের কৃষকদের আন্দোলন শুধু যে প্রকৃতিগতভাবেই ভিন্ন, তা নয়; সেটি ভারতের রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে। এসব প্রমাণ করছে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ও অংশগ্রহণমূলক অর্থনীতির আকাঙ্ক্ষা ২০২০ সালে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমিয়ে দেওয়া যায়নি; নাগরিকেরা অধিকার চান। এই আকাঙ্ক্ষা সর্বজনীন।

২০২০ সালে একদিকে যেমন সরকারের পক্ষ থেকে সুযোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তেমনি সুযোগ গ্রহণ করেছে উগ্র ও জঙ্গিবাদীরা। মালিতে আল-কায়েদার শক্তিশালী অবস্থান এবং অক্টোবর মাসে বুরকিনা ফাসো ও নাইজার সীমান্তে হামলা ও সংঘর্ষ তার উদাহরণ। ৩০ নভেম্বর মালির কিদাল, মেনাকা এবং গাও শহরে অবস্থিত তিন ফরাসি ঘাঁটিতে আল-কায়েদা হামলা চালিয়েছে। আফ্রিকায় আল-কায়েদার উপস্থিতিই কেবল ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের শক্তি সঞ্চয়ের উদাহরণ নয়, বরং যে বিষয় বাংলাদেশের পাঠকদের মনোযোগ বেশি দাবি করে তা হচ্ছে, আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেট (আইএস) যোদ্ধাদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানের চুক্তি নিঃসন্দেহে ২০২০ সালের অন্যতম ঘটনা; বছরের গোড়াতে স্বাক্ষর করা এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পরাজয়ের দলিল, কিন্তু এতে করে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে ১৮ বছরের উপস্থিতির অবসানের পথ করেছে। সেটা যে শর্তে এবং যেভাবে করেছে, তাতে ফলোদয় হবে কি না, সেটা দেখা যাবে ২০২১ সালে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই তালেবান ও আফগান সরকার বিভিন্ন ধরনের ঐকমত্যে পৌঁছেছে। ডিসেম্বরের গোড়াতে বড় ধরনের অগ্রগতিও হয়েছে। তালেবানের পক্ষ থেকে এই চুক্তি এবং ঐকমত্যের একটি কারণ হচ্ছে আইএসের প্রভাব বৃদ্ধি। তালেবান এখন যেভাবেই হোক, তা রুখতে চায়। কিন্তু আফগানিস্তানে এই শান্তিপ্রক্রিয়ার ফল কেবল আফগানিস্তানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আফগানিস্তানে দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তান ও ভারত নিজ নিজ প্রভাববলয় বাড়ানোর লড়াইয়ে যুক্ত, শান্তি চুক্তির বাস্তবায়নের পর তা যে নতুন মাত্রা নেবে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।