জাতীয়তাবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক দর্শন নয়

জাতীয়তাবাদ আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে জাতীয়তাবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক দর্শন নয়, বরং জনগণের আত্মপরিচয়, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। জাতীয়তাবাদ মানুষকে একই পতাকার নিচে একত্র করে, তাদের মধ্যে অভিন্ন পরিচয়ের ধারণা জাগায় এবং স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের জন্য আত্মত্যাগের প্রেরণা জোগায়। জাতীয়তাবাদ হলো একটি কল্পিত সম্প্রদায়, যেখানে অপরিচিত মানুষও একই প্রতীকের মাধ্যমে নিজেদের একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির অংশ হিসেবে কল্পনা করে। এই কল্পনা কখনো বাস্তবের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে, কারণ এটি জনগণকে ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মিথের সঙ্গে জুড়ে দেয়, যা জাতিরাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি নির্মাণ করে।তবে জাতীয়তাবাদ কখনোই একমাত্রিক নয়। এর একটি ইতিবাচক রূপ রয়েছে, যা স্বাধীনতা, ঐক্য, সংস্কৃতি এবং গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। পরাধীন জাতির জন্য জাতীয়তাবাদ মুক্তির মন্ত্র হয়ে উঠেছে। ভারতবর্ষে গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস আন্দোলন, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সশস্ত্র সংগ্রাম কিংবা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ—সবকিছুই জাতীয়তাবাদের অনুপ্রেরণায় পরিচালিত হয়েছে। ভাষা আন্দোলনও এ ধারারই অংশ, যেখানে জনগণ ভাষাকে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক হিসেবে দেখেছিল। শহীদ মিনার তাই শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং জাতীয়তাবাদের প্রতীকী স্মৃতিস্তম্ভ। জাতীয়তাবাদের এই রূপ জনগণকে আত্মমর্যাদাবোধে উজ্জীবিত করেছে এবং গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশে সহায়তা করেছে। তবে জাতীয়তাবাদের আরেকটি রূপ রয়েছে, যা সভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ। ইতিহাস সাক্ষী যে এই বিকৃত জাতীয়তাবাদই সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ এবং জাতিগত সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে জাতীয়তাবাদ একদিকে আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-determination), স্বাধীনতা (independence) এবং সার্বভৌমত্ব (sovereignty)-এর ভিত্তি রচনা করেছে, অন্যদিকে চরম জাত্যাভিমান (chauvinism), বর্ণবাদ (racism), সাম্রাজ্যবাদ (imperialism) ও যুদ্ধ (warfare)-এর প্রধান উৎস হিসেবেও দেখা দিয়েছে। এই দ্বিমুখী চরিত্রের কারণেই জাতীয়তাবাদকে নিয়ে বিতর্ক থামেনি। কেউ মনে করেন, এটি মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রার চালিকাশক্তি, আবার অনেকে বলেন এটি আধুনিকতার অন্তর্নিহিত হুমকি। জাতীয়তাবাদের ধারণা আসলে তুলনামূলকভাবে আধুনিক। এরিক হবসবম (Eric Hobsbawm) এবং বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন (Benedict Anderson) জাতীয়তাবাদকে আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তার অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে দেখেছেন। আসলে, বাস্তবে কোনোদিন প্রত্যেকে একে অন্যকে চেনে না, তবু একটি ভাগাভাগি করা কল্পনায় ঐক্যবদ্ধ থাকে। এই কল্পিত ঐক্যের ভিত্তিতেই আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ জাতীয়তাবাদী চেতনার মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক imagined community-এরই বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এই কল্পনা ইতিবাচক হওয়ার পাশাপাশি বিভাজনমূলকও হতে পারে। যেমন : ভারত-পাকিস্তান বিভাজন, কিংবা ইউরোপে বর্ণবাদী জাতীয়তাবাদ, যা সংঘাত সৃষ্টি করেছে।