বিশ্ব রাজনীতি এবং জ্বালানি বাজারে একটি বড় পরিবর্তন

সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃক ওপেক (OPEC) ত্যাগ করার বিষয়টি মূলত ভূ-রাজনৈতিক কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। এটা বিশ্ব রাজনীতি এবং জ্বালানি বাজারে একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ওপেকের ভেতরে সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে তেলের উৎপাদনসীমা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান কারণগুলো এবং এর লাভ-ক্ষতি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

আমিরাত গত কয়েক বছরে তাদের তেল উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে তাদের প্রতিদিন প্রায় ৪০-৪৫ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলনের ক্ষমতা আছে। কিন্তু ওপেকের কোটা পদ্ধতির কারণে তারা এই সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না, যা তাদের আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে। আমিরাত তাদের অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনতে চায়। অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ (ভিশন ২০৩১) রূপান্তরের জন্য তাদের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। বেশি তেল বিক্রি করে দ্রুত সেই তহবিল গঠন করাই তাদের লক্ষ্য।

ওপেকের নীতি মূলত সৌদি আরবের প্রভাববলয়ে থাকে। আমিরাত এখন আর কেবল জুনিয়র পার্টনার হিসেবে থাকতে চাচ্ছে না, বরং স্বাধীনভাবে নিজেদের বৈশ্বিক জ্বালানি নীতি পরিচালনা করতে আগ্রহী। ওপেকের বাধ্যবাধকতা না থাকলে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো তেল উৎপাদন ও বিক্রি করতে পারবে। এতে তাদের জাতীয় আয় বাড়বে এবং আধুনিকায়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। ওপেকের বাইরে থাকলে তারা কম দামে বেশি তেল বিক্রি করে বাজারের বড় অংশ দখল করতে পারবে।

যদি আমিরাত বেশি তেল বাজারে ছাড়ে, তবে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে। সরবরাহ বাড়লে তেলের দাম কমতে পারে, যা আমদানিকারক দেশগুলো, বিশেষত ভারত ও চীনের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে।

এতে ক্ষতির সম্ভাবনাও আছে। কাতার ও অ্যাঙ্গোলার পর আমিরাতের মতো বড় উত্তোলক দেশ বেরিয়ে গেলে ওপেকের জোটবদ্ধ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের যে একচ্ছত্র ক্ষমতা ওপেকের আছে, তা হুমকির মুখে পড়বে। সৌদি আরবের জন্য এটি বড় একটি ধাক্কা। ওপেকের প্রধান নেতৃত্ব হিসেবে তাদের কথা মানার প্রবণতা কমে যাবে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। অবাধ উৎপাদনের ফলে তেলের দাম অনেক কমে যেতে পারে, যা অন্যান্য তেল রপ্তানিকারক দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করবে। এছাড়া তেলের জোগান বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রার জন্য নেতিবাচক।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই সিদ্ধান্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ খুশি এবং তিনি একে প্রকাশ্যে স্বাগত জানিয়েছেন। গত ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই পদক্ষেপকে ‘দুর্দান্ত’ (Great) বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্পের খুশির পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে—ট্রাম্প মনে করেন, আমিরাত ওপেক থেকে বেরিয়ে গিয়ে স্বাধীনভাবে তেল উৎপাদন করলে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে। এতে তেলের দাম এবং বিশেষ করে আমেরিকায় পেট্রোলের (গ্যাসোলিন) দাম কমবে। তিনি বলেছেন, ‘এটি তেলের দাম কমানো এবং সব কিছুর দাম কমানোর জন্য একটি ভালো দিক।’