জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর কাছে আসা এবং কিছু ঘটনা

সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের মহান নেতা লেনিনের জীবনী পড়েছি, উনাকে বুঝবার চেষ্টা করেছি। উনি বিপ্লবী চিন্তার অধিকারী ছিলেন। মার্কস এঙ্গেলসের অনুসারী ছিলেন। আগাগোড়া আমি সমাজতন্ত্রের বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও যারা তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের সমস্যাটাকে বোঝার বা মানুষের সমস্যা সমাধানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন পৃথিবীর এমন অনেক নেতা যেমন হো চি মিন, লেনিন, মাও সেতুং, ফিদেল ক্যাস্ট্রো এদেরকে আমি শ্রদ্ধা করতাম। কিন্তু যারা বিপ্লব সফল করতে পারেনি, শুধুই বিপ্লবের নামে গণহত্যা করেছে তাদের প্রতি আমার কোন শ্রদ্ধা নেই। যারা সফল হয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধার মূল কারণ হলো তারা যা চিন্তা করেছেন সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তাদের নির্মিত পথে তারা বিজয়ী হয়েছেন। লেনিন মার্কস এঙ্গেলসের ধারণাটাকে সামনে নিয়ে নিজ আঙ্গিকে নিজস্ব চিন্তার অবকাঠামোয় সেটাকে ফেলে একটা সফল বিপ্লব করে বিরাট একটা অঞ্চলে সর্বহারার শাসন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এবং যেহেতু বিপ্লবের আনকোরা অবস্থায় লেনিন ক্ষমতায় ছিলেন তাই সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে অনেক কিছুই বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অনেক পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন, সংযোজন হয়েছে।

এর আগে আমি কখনো মমি দেখিনি।  লেনিনের মরদেহ যখন দেখতে গেলাম তখন মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণ আগে একটা মানুষ ঘুমিয়ে গিয়েছে, একদম জ্বলজ্বল করছে। একদম বিচিত্র অনুভূতি। তিনি তো অনেক আগে মারা গিয়েছেন। কিন্তু মনে হচ্ছে তিনি এইমাত্র মারা গেছেন। এই দুইটা সংমিশ্রিত অনুভূতি বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। আমি কোনো অভিবাদন জানাই নি। কিন্তু তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ছিলো। আমার সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের যেসব নেতৃবৃন্দ ছিলেন তারা অনেক আবেগ-আপ্লুত ছিলেন। যতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি তার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা, শৈশবের কথা, যৌবনের কথা, তার লেখাপড়া, অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ এই যে বিশাল সফলতার ধারাবাহিকতা চিন্তা করেছি; এই লোকটা পৃথিবীর এতো বড় একটা বিপ্লব সংঘটিত করেছে, এতো বড় একটা চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করার রূপকার। আমরা তো স্বাধীনতা যুদ্ধ পেরিয়ে এসেছি। যে কোন স্বাধীনতার জন্য বা যে কোন মুক্তির জন্য যে নেতৃত্বই হোক না কেন তার প্রতি আরেকটি স্বাধীনতাকামী মানুষের শ্রদ্ধাবোধ তো থাকার কথা।
তখনকার আঙ্গিকে যা কিছু বুঝেছি, যা কিছু শুনেছি, যা কিছু দেখেছি বঙ্গবন্ধুর কাছে সেটা না বলতে পারলে একটা বদহজমের মতো অবস্থা তৈরি হতো। স্বস্তি পেতাম না। তার হৃদয়ের গভীরে একটা অকৃত্রিম ¯েœহ ছিলো আমার প্রতি। এই জন্য তিনি স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি মনোযোগ দিয়ে আমাকে শুনতেন। এই জন্যও নিজেকে বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী মনে হয়। মুজিব ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করলোÑ লেনিনের মাজারে গিয়ে কি বলেছিলি? আমি বললাম, আমি কিছুই বলিনি। তবে তার সফল বিপ্লবের কথা চিন্তা করছিলাম যে, ১৭ শতাংশ মানুষের সক্রিয় সমর্থন নিয়ে তিনি কিভাবে মেহনতি মানুষকে সংগঠিত করে এই বিশাল ৫০০ বছরের ঐতিহাসিক সাম্রাজ্য ভেঙে দিয়ে এইরকম একটা বিপ্লব সংগঠিত করলেন। আমাদের চিন্তা-চেতনায় বঙ্গবন্ধুর ভাবমূর্তি যেভাবে আচ্ছন্ন থাকতো; যে কোন একটা বিশ্বখ্যাত নেতৃত্বের কথা ভাবলে তার নামটাও এসে যেত। যেটাও বললাম যে, আপনার কথাও মনে হয়েছে, ধারাটা ভিন্ন, পথ চলাটা ভিন্ন, চেতনাটা ভিন্ন কিন্তু লক্ষ্যটা তো একই ছিলো। তার দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি তার মানুষের মুক্তি চেয়েছেন; আপনি আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলার মানুষের মুক্তি চেয়েছেন। তিনি বললেনÑ ‘কবর জিয়ারত করলে, মাজার জিয়ারত করলে, এদিক-ওদিক গেলে মনে হয় না!’ আমি তো কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না কথাটা। আমি বললামÑ এ যে তুলনা করছিলাম, তার অতীত চিন্তা করছিলাম। তিনি বললেনÑ ‘আরে আমি বলছিÑ ফি নারে জাহান্নাম, তুমি কমিউনিস্ট, আল্লাহ মানো না, তোমার কপালে জাহান্নামী আছে।’ আমি সেটাকে তখন কৌতুক হিসেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু আমি জানি না কেন, পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের দিকে খেয়াল করে দেখলামÑ এরা নামাজ পড়ে, রোজা রাখে, ধর্মভীরু এবং যারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে, ধর্মকে যারা রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, যারা অনুভূতিকে নাড়া দিয়ে যারা ধর্মের নামে বিভ্রান্ত করে, যারা মানবতাবিরোধী কাজ করে তাদের চেয়ে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতৃত্বে ধর্মীয় চেতনার অধিকারী। কিন্তু কোথায় যেন ব্যত্যয়, কোথায় যেন সামান্য একটু মুরতাদি ভাব। কিন্তু আমি একেবারে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এটা বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করার জন্য বলছি না, এটা জেলখানাতেও আমি দেখেছি। যে কোন বক্তার বক্তৃতা আমি শুনতে যেতাম, আমি পছন্দ করতাম। যেমন ফরিদ সাহেব খুব ভালো পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন। উনি পার্লামেন্টে গিয়ে বলার সুযোগ পায় নি। তখনকার দিনে রেডিওতে যতটুকু রিপ্রেজেন্ট করতো সেটুকুই খুব মনোযোগ সহকারে শুনতাম, অনেক সময় লিখে রাখতাম।
জেলখানায় একদিন ড. রাজী সম্পর্কে আমি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছি। তখনও বঙ্গবন্ধুর খুব তীব্র প্রতিক্রিয়া আমি লক্ষ্য করেছি। ডা. রাজী খুব ভালো বলতেন। উনি বললেনÑ ডা. রাজী এতো ভালো বলতেন যে, উনার অঙ্গভঙ্গিটাকে যদি চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া যেত, উনার অঙ্গভঙ্গিটা একটি ক্যারিকেচার টাইপের। সার্কাসের ক্লাউন টাইপের নাকি ছিলো। তাছাড়া, উনার বক্তৃতা এতো ভালো ছিলো যা কিনা পৃথিবীর যে কোন সেরা পার্লামেন্টারিয়ানের সঙ্গে তুলনা করা যেত। তারপরেও বঙ্গবন্ধু বললেনÑ শালা নাস্তিক। পশ্চাৎ ঊর্ধ্বে তুলিয়া, মস্তক নিচে রাখিয়া মুসলমানেরা যে সেজদা দেয় এটা কি! সেদিন থেকেই আমি এ শালারে দুই চোখে দেখতে পারি না।
আমি বঙ্গবন্ধুকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে দেখিনি। তবে কথাবার্তার মধ্যে ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ চাইলে এরকম কথা আমি অনেকবার শুনেছি। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে একটা কথাÑ ধর্মের প্রতি, আল্লাহ-রসূলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আনুগত্য প্রশ্নাতীত ছিলো।
আমরা কিন্তু কখনোই খুন-খারাবির মধ্যে ছিলাম না। তবে মামলা একটা পেলে আমাদেরকে জুড়ে দিতো। ’৫৮ সালের পর আইয়ুব খান যেমন বঙ্গবন্ধুর নামে অসংখ্য দুর্নীতির মামলা জুড়ে দিয়েছিলো ঠিক তেমনি ’৬৬ সালের পর আমাদের নামে অনেক মামলা জুড়ে দিয়েছিলো। এবং এক হিসেবে মামলাগুলো আমাদেরকে সাহায্য করেছিলো। আমরা এতে কোন কষ্ট পাই নি বরং উৎফুল্ল থাকতাম। প্রথম কারণ হচ্ছে, প্রতি ডেটে আমরা বাইরে আসতাম। বাইরের মুক্ত আবহাওয়ার যে একটা পরিবেশ আর রাজবন্দি হওয়ার কারণে সকলেরই একটা ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিলো। আমাদেরকে সম্মানের সঙ্গে নিয়ে আসতো। পুলিশ ব্যারাকের পেছনের ছাদে আমাদেরকে রাখতো। ওখানে খাওয়া-দাওয়া হতো। বন্ধু-বান্ধব, অনুরাগী, নেতাকর্মী সবার সঙ্গেই মেশার অবারিত সুযোগ পাওয়া যেত। সর্বোপরি খবরাখবর আদান-প্রদানের একটা মহাসুযোগ ছিলো। শেষের দিকে তো আমি দলের ডাকপিয়ন হয়ে যাই; দূত বললে বড় করে বলা হবে। বঙ্গবন্ধু যেটা বলে দিতেন ঠিক সেটাই এসে বলতাম। আমাদের পক্ষে যাক বা বিপক্ষে যাক। অনেক সময় চিরকুট বহন করা যেত না। চিরকুট বহন করতে পারলে তা যথাস্থানে পৌঁছে দিতাম।
আমার ঠিক মনে নেই, ১৫ কি ১৬ই জুনে আইয়ুব খান আসবেন ঢাকায়। আমাদের ১৫-১৬ জনের দায়িত্ব পড়লো উনি যেদিন আসবেন সেদিন কালো পতাকা দেখাতে হবে। সেটার জন্য শ্রমিকেরা কাজ শেষে যে মেসে থাকতো  সেখানে সেখানে গিয়ে সারারাত আমরা তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। রাত সাড়ে তিনটা-চারটার দিকে প্রচ- ক্ষুধা লাগছে। বাবু সুধীর কুমার হাজরা ছিলো, খালেদ মোহাম্মদ আলী ছিলো, কামরুজ্জামান টুকু ছিলো, ফিরোজ নূন ছিলো (পরে বিএনপিতে গেছেন) এরকম আরো অনেকেই ছিলো। আমি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললামÑ শুতে যাওয়ার আগে একটা কিছু খেতে হবে। কি খাওয়া যায় ভাবতে তেজগাঁও রেলগেটের কাছে একটা রেস্টুরেন্ট পেলাম। এর আগে যে বক্তৃতা করেছিলাম তাতে হোটেলের বয়’রা আমাদেরকে চিনলো। একদম চেয়ার টেয়ার সাজিয়ে বসতে দিলো। বললো, স্যার, গোশত তো শেষ হয়ে গেছে। গরম জিলাপি ভেজে দিচ্ছি আর পরোটা। আমি বললামÑ সেটা তো অমৃতের মতো মনে হবে, করো। একদম চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে বসেছি গরম জিলাপি আর পরোটা খাবো বলে। এর মধ্যে কে যেন বললো পুলিশ। পুলিশ বলার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই দৌড়। আমি মোটা মানুষ, বেশি দৌড়াতে পারি না। কামরুজ্জামান টুকু পরে আমাকে বলছে, আমার খুব মায়া লেগেছিলো আপনাকে একা ফেলে চলে যেতে, তাই আমি থেকে গেছি! পুলিশ এসে আমাকে এমনভাবে আক্রে ধরছে যে, আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। কামরুজ্জামান টুকু তখন বিরাট উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। পুলিশ যখন বললোÑ আপনি কে? তখন সে বললোÑ আমি সিদ্দিকী ভাইয়ের সঙ্গে এসেছি। উনি যদি বলতেন আমি এখানে কাজ করি, হোটেলের বয় বা অন্য কিছু তাহলে হয়তো উনি বেঁচেও যেতে পারতেন। শহীদুল্লাহ দৌড়ে এসে পারে তো পুলিশের কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। যাই হোক, আমি বললামÑ এ জিনিস আমার জানা আছে। বহুবার আসা-যাওয়া করছি। ওকে, আমি গ্রেপ্তার। আপনাদের অ্যারেস্ট আমি মেনে নিলাম। কোথায় নিয়ে যাবেন চলেন।  আমাদের তিনজনকে না বেঁধে, হ্যান্ডকাফ না পরিয়ে জিপের মধ্যে ওঠালো। আমার ধারণা থানায় নিয়ে রাখবে, পরের দিন যাতে আমরা ডেমনস্ট্রেশনটা দিতে না পারি। এর আগে ’৬২-৬৩ তে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে বা হাঁটানোর জন্য রাস্তার অনেক দূরে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। এই প্রথম টের পেলাম যে, এবার ভালো ধরা খেয়েছি। যে আমাকে ধরছে সে সিটি এসপিকে ফোন দিয়ে বললোÑ স্যার, বড় কাতলা ধরে ফেলেছি, ঐ যে ছেলেটি বক্তৃতা করেছিলো! তখন লিকলিকে চিকন ছিলাম। দৌড় দেই নি গুলির ভয়ে। জেলে যাওয়ার পরই আমি মূলত মোটা হয়ে যাই। আমাদের বসতে দিলো একটা হাতলওয়ালা বেঞ্চে। কিছুক্ষণ পর সিটি এসপি আসলেন। খুব হ্যান্ডসাম, নামটা আমি ভুলে গেছি। এসে এ কথা-সে কথার পরে সে জানতে পারছে আমি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র। তখন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্ররাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিএসপি-পিএসপি পেত। এবং ওখানে যারা থাকতো তারা মোটামুটি সবাই অভিজাত। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশনের অনেকেই সিএসপি হয়েছেন। আমাদের আলামীন চৌধুরী (তখনকার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট) সিএসপি হয়েছিলেন, রফিকউল্লাহ চৌধুরী সাহেব, মনোয়ারুল ইসলাম সাহেব এমন অনেক সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রলীগের ছেলেরা সিএসপি হয়েছেন। সিটি এসপি সাহেবের রাগ কিছুটা কমে গেছে মনে হলো। উনি আমাকে খুব মার্জিত ভাষায় বললেনÑ বলুন, আপনার জন্য আমি কি সাহায্য করতে পারি? আমি বললামÑ একটাই সাহায্য করতে পারেন। আমরা খুব ক্ষুধার্ত, কিছু খাওয়াতে পারলে খুব খুশি হবো। চা-সহ বিস্কুট হলেই চলবে। উনি বললেনÑ তার চেয়ে ভালো হলে! আমি ঠাট্টা করতেছি। আমি বললাম, আরে ভাই তার চেয়ে ভালো খেতে গিয়েই তো এই পরিণতি। গরম জিলাপি আর পরোটা খেতে গিয়েই তো ধরা খেলাম। তখন জীবনের প্রতি উচ্ছ্বাস এতো বেশি, লালিত আদর্শের প্রতি আনুগত্য এতো প্রখর যে, তখনকার আনন্দটাই তখনকার আনন্দ। মানে আমার কি হবে, ভবিষ্যৎ কি হবে, কতদিন জেল হবে এগুলো নিয়ে ভাবতাম না। এটা ছেলেমানুষী কিনা জানি না, যৌবনের উচ্ছ্বাস কিনা জানি না। তখন উনি বললেনÑ আমি আপনাদেরকে খুব ভালোভাবে নাস্তা খাওয়াবো। তারপর উনি ওসিকে নির্দেশ দিলো। ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে দুই-তিন পদ মিষ্টিসহ গরম পরোটা চলে এলো। সিটি এসপি এসে বললেনÑ অল রাইট? আমি বললামÑ ভেরি গুড, থ্যাংক ইউ; তবে আরেকটা ফেবার আপনি আমাদের জন্য করলে খুশি হবো। উনি বললেনÑ বলেন! আমি বললাম, আপনারা যদি জেলগেট পর্যন্ত এই সুন্দর জিপটা দিয়ে আমাদের একটু পৌঁছে দেন, কখন যে হাজতে নেবে, আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি, দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না, ঘুমে দু’চোখ ভেঙে যাচ্ছে! উনি বললেনÑ আপনি কি করে বুঝলেন যে আপনাকে জেলে যেতে হবে? আমরা তো ছেড়েও দিতে পারি! আমি তো আগের কথা শুনে নিশ্চিত হয়েছি যে, আমাকে জেলে যেতেই হবে। বারবার তো আর কোতোয়ালি থানা থেকে ছাড়া পাবো না। উনারা দুজন তাৎক্ষণিকভাবে আমার সঙ্গে মোটামুটি একমত। উনাদের মনের অবস্থা তো আমি বলতে পারবো না। আমি মোটামুটি একটা জলি মুডেই রয়েছি। আর যারা পালিয়ে গেছে তাদেরকে মনে মনে গালি দিচ্ছি। বিশেষ করে খালেদ মোহাম্মদ আলীকে, যে তুমি ফসকায়ে গেলে!
যাই হোক, উনি যখন বললেন ছেড়েও দিতে পারি, আমি তখন বললাম, ছেড়ে দিলে দেন। আপনারা তো আমাদেরকে ছাড়বেন না। আমরা যেহেতু সবাই মার্স্টার্স পাস এবং রাজনীতি করি সেহেতু আমরা খুব বোকাও না। বরং আপনি যদি জেলখানা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেন সেটা বহু বহু সাহায্য হবে, কৃতজ্ঞ থাকবো। উনি বললোÑ অল রাইট, জাস্ট অ্যা মিনিট! উনার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললো। এসে বললোÑ চলেন আপনার যখন এতোই জেল খাটার শখ, আসেন আমিই ড্রাইভ করে দিয়ে আসি, কিন্তু কোনভাবেই লাফ-ঝাঁপ দেয়ার চেষ্টা করবেন না, গোলাগুলি হবে; আমার এই যে সৌজন্যবোধ এটাকে কিন্তু দুর্বলতা ভাববেন না। উনার ধারণা আমি এইসব মিঠামিঠা কথা বলে আমি স্টেপ করার চেষ্টা করতেছি। সত্যি কথা বলতে আমার সেটার কোন ইচ্ছেও ছিলো না। আমি বললাম, আমার সেটার কোন ইচ্ছে ছিলো না, তবুও থ্যাংকস ফর রিমাইন্ডিং। সব ফরমালিটিজ মেইনটেইন করতে করতে সকাল ৭-৮টা বেজে গেছে। উনি জেলে ঢুিকয়ে দিয়ে চলে গেল।
তফাজ্জল সাহেব নামের এক ভদ্রলোক পলিটিক্যাল সেলের ডেপুটি জেলার। ডেপুটি জেলার যেরকম চোটে-পাটে জেলখানায় ঢুকলো আমার তো মনে হলো উনি ডিআইজি। দুই-তিনজন জেলের সেপাই নিয়ে উনি ঢুকলেন। নাজির জমাদার। তিনি অবাঙালি ছিলো, বিহারি ছিলো। পরে আমরা থাকাকালীন অবস্থায়ই সে সুবেদার মেজর হয়। জমাদারের পরে নন কমিশনে সর্বোচ্চ র‌্যাংক হলো সুবেদার মেজর। সে প্রচ- রসিক ছিল। ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথা বলতো। উর্দু, বাংলা মিশিয়ে কথা বলতো। আমার তখন প্রচুর ক্লান্তি এবং বিপর্যস্ত অবস্থা। একটুখানি ঝিমানি আসছে, কোথাও গিয়ে শুয়ে পড়তে পারলে জীবন বাঁচে আর কি! আমি তফাজ্জল সাহেবকে বললাম, আপনার র‌্যাংক কি ভাই? উনি বললেনÑ আমি ডেপুটি জেলার, পলিটিক্যাল সেলটা দেখি। আমি বললামÑ আমাদের একটু শোয়ার ব্যবস্থা করলে ভালো হতো। উনি বললেনÑ চা-টা খেয়েছেন? আমি বললামÑ সব খেয়েছি, বিকাল পর্যন্ত কিছু না খেলেও সমস্যা হবে না; শুধু একটু শোয়ার ব্যবস্থা করেন। উনি বললোÑ আপনারা কোথায় থাকবেন কিভাবে কি সেটা এখনও ঠিক হয়নি। আমার ডিপার্টমেন্ট আপনাকে রিসিভ করেছে গ্রেপ্তার হিসেবে; যেহেতু আপনাদের কোর্টে নেয় নি, সেহেতু আপনাদের ব্যাপার-স্যাপার একটু ভিন্ন মনে হচ্ছে। খানিক বাদে হাতে তিনটা কাগজ নিয়ে নাহির জমাদার বলেÑ বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান/এইবার ঘুঘু তোমার বধিবে পরাণ। এইসব শ্লোক বলতেছে। আমি বললামÑ কি হয়েছে বলবেন তো।
আমি অনেক খুশি হয়েছি। আমার জীবনের অতি সামান্য অর্জনের বিভিন্ন দিক আমি লক্ষ্য করেছি। সেদিন আমাকে খুব পরিতৃপ্ত মনে হয়েছে। সেদিন আমার মনে হয়েছিলো ক্ষমতার রাজদ- বোধহয় আমার হাতে। তখন আমার অনেক বন্ধুরা নিরাপত্তা বন্দি হিসেবে থাকছে। তখন ডিপিআর (ডিফেন্স অফ পাকিস্তান রুলস)-এ ঐ ডিটেনশনটা হয়। ৭৩ জন পূর্ব পাকিস্তানি ছিলো। খান মোহাম্মদ আলী একমাত্র পশ্চিম পাকিস্তানি ছিলো। এমনিতেই তো হাজার হাজার নিরাপত্তা বন্দি থাকতো কিন্তু একটা সময়ে একসঙ্গে ৭৩ জন সর্বোচ্চ ছিলো। তখন আমি আবেগ-উচ্ছ্বাসে বিহ্বল। আমার সমস্ত হৃদয়ের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ। আমি নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ আবৃত্তি করছি। ডেপুটি জেলার ভাবছে, শালা পাগল নাকি! আমি আবৃত্তিও ভালো করতাম। ওরা আমাকে থামাচ্ছেও না। একটু পরে বলছেÑ আভি তো বহুত খোশ গ্যায়া। খবর তো আ রাহা হো এক ভি পুরা হ্যায়। আমি বললামÑ আউর কিয়া পুরা হ্যায়? ম্যারা ফাঁসি ক্যা অর্ডার? বলেÑ নেহি নেহি, আপকো সেল কো গোজা দিয়া। জেল কো আন্দার হ্যায় সেল, উসকা বলতা হ্যায় সেল। শহীদুল্লাহকে বোধহয় দিলো ১-২ খাতায়। আমাকে আর কামরুজ্জামান টুকু সাহেবকে নিয়ে এক-দুই খাতা পেরিয়ে ৪০ সেলে। টুকু সাহেব একটু প্রচারবিমুখ লোক। আমি তখন ঢাকায় ডাকসাইটে কর্মী আর উনি তখন সেন্ট্রাল ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি। ভাবখানা এমন যেন মনে হতো, আমি উনার নেতা, উনি আমার কর্মী। উনি তখনও আমাকে নূরে আলম ভাই ডাকতেন, এখনও। অতি বিন¤্র মানুষ। তো উনি আমাকে বলছেনÑ আরে চুপ করেন না, চুপ করেন, এতো উত্তেজিত হয়েন না। আমাকে প্রথমে নিয়ে গেল, উনাকে রেখে গেল। একসঙ্গে নেয় নি। লম্বা একটা রাস্তা দিয়ে গিয়ে ১-২ খাতা পেরিয়ে হাতের ডানদিকে যেতে হবে, যাওয়ার পরে একটা প্রাচীর, প্রাচীরের সঙ্গে একটা গেট আছে। এ গেট দিয়ে একটু কুঁজো হয়ে ঢুকতে হতো। বঙ্গবন্ধুর মতো লম্বা হলে তো আরো কুঁজো হয়ে ঢুকতে হতো। হাতের ডানদিকে ফোর্টি সেল। ৪০টি সেলে ৪০টি বদ্ধ উন্মাদ থাকতো। তার ঠিক উল্টো দিকে দেওয়ানী, যেখানে একটা বড় লম্বা ঘর; সেই ঘরে তখনকার মুজিব ভাই, আমি তো মুজিব ভাই ডাকতাম, আমি খুব মুডে থাকলে বস ডাকতাম। দেওয়ানী থেকে ১৫-২০ ফিট দূরে ছোট্ট একটা ঘর। পরে জানলাম, ঐটা মুজিব ভাইয়ের রান্নাঘর। ওনার বাবুর্চি ছিলো, মেট ছিলো; ওনার রান্নাটা ওনার সামনে হতো। আর আমাদের সকল রাজবন্দিদের রান্না হতো ১-২ খাতায় রাজবন্দিদের তত্ত্বাবধানে। ওখান থেকে অন্যান্য সেলে খাবার যেত। ওখান থেকে ১০ নম্বর সেল যেটা সেখানে মানিক ভাই, নজরুল ইসলাম সাহেব, ক্যাপ্টেন মনসুর, তাজউদ্দীন সাহেব, কামরুজ্জামান সাহেব, নেত্রকোনার মমিন সাহেব, ওবায়েদ ভাই, জালাল ভাই (গোপালগঞ্জের মোল্লা জালাল), মোস্তফা সরোয়ার সাহেব থাকতেন। আর কমিউনিস্ট নেতা যারা ছিলেনÑ মনিকৃষ্ণ সেন, অমূল্য লাহিড়ী, সত্যেন সেন, জিতেন দা, ফরিদপুরের সমর সেন, পরবর্তীকালে আসলেন ময়মনসিংহের অজয় রায়, মৃনাল সেন। নতুন বিশে যখন ছিলাম তখন ছিলোÑ হাতেম আলী, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, সিরাজুল হোসেন খান, হাজী মোহাম্মদ দানেশ।
উনার দেওয়ানীর পাশ দিয়ে ছোট্ট একটা লন মতো ছিলো, অনেক সুন্দর করে গাছ লাগানো ছিলো, ঐটা পেরিয়ে ৪০ সেল শেষ। এরপরে রেলওয়ে কলোনির মতো যেটাকে বলা হয় পুরনো বিশ, সেখানে বিশটি সেল ছিলো। প্রত্যেক সেলে একজন করে বন্দি থাকতো। আমার ছিলো একটা লোহার খাট, একটা চেয়ার, একটা টেবিল। সেখানে আমি যখন যাচ্ছি তখন উনি রান্নাঘর থেকে বের হচ্ছে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে দিয়ে, পরনে লুঙ্গি, মাথার মধ্যে অ্যারাবিয়ান কায়দায় টাওয়াল প্যাঁচানো। সতিন সেনগুপ্তের সিরাজউদ্দৌলা নাটকের প্রায় সব ডায়ালগই  আমার মুখস্ত ছিলো। আমি বঙ্গবন্ধুকে দেখে বলছি যেন উনি নবাব সিরাজউদ্দৌলা আর আমি আবুল হোসেনÑ সুদিনে কাছাকাছি ফিরেছি, দুর্দিনেও তোমার কাছ থেকে কি দূরে থাকতে পারি! বাংলার সম্ভাব্য মহান স¤্রাট, তোমার আদর্শ আমাকে উজ্জীবিত করেছিলো, তোমার ত্যাগ আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিলো, তোমার বাংলার প্রতি ভালোবাসা আমাকে রাজনীতিতে অনুপ্রাণিত করেছিলো। তোমার ভালবাসা আমাকে কারাগারে টেনে নিয়ে আসলো। তুমি কারারুদ্ধ, আমি তো মুক্ত জীবনযাপন করতে পারি না। তোমাকে যখন তারা অবরুদ্ধ করেছে তখন আমার আত্মা, আমার অনুভূতি, আমার সত্তা কারাগারে আসার জন্য উন্মুখ ছিলো। উনি হাতের মধ্যে ছড়িটা নিয়ে আমাকে মারে আর কি! তবে রাগ তো হয়-ই নি, খুশিই হয়েছিলো। বলেÑ কয়েকদিন থাকো, সব উচ্ছ্বাস চলে যাবে। প্রথম প্রথম সবারই এমন থাকে। তারপর বলেÑ দেখি তোমার হাতটা। আমি হাতটা এগিয়ে দিলাম। হাত দেখে বলেÑ তিন মাসে ফাড়া কাটবে বলে মনে হয় না। আমি এইভাবে বললাম যে, কয়দিনে কাটবে জ্যোতিষী দূত? কতদিন থাকবো সেটা না বলে গম্ভীরভাবে বললো, সয়ে যাবে।
আমাকে নতুন বিশে নিয়ে রাখলো। নতুন বিশে আটকানোর পর থেকে যেদিন রাতে উনাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার জন্য ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গেল ততদিন পর্যন্ত। উনার দেওয়ানীর সঙ্গে অ্যাটাচ্ট যেটা ছিলো সেটা নতুন বিশ। বেশ কিছুদিন পর আমাকে আরো একটু কাছে এনে দিলো। পুরনো বিশে আমরা যখন ছিলাম তখন আমি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫-১৬ ঘণ্টা একসঙ্গে থেকেছি। তার লকআপ সাধারণত ৫-৬টায় অর্থাৎ সূর্য ডোবার আগে আগে লাগিয়ে দিতো। কিন্তু মুজিব ভাই’র খাতিরেই আমাদের লকআপটা দেরিতে হতো। আমরা শুধু গিয়ে ঘুমাতাম। কিছুদিন বাকি ভাই খ-িত মামলায় এসেছেন, কমরেড রাশেদ খান মেনন এসেছেন। পরবর্তীকালে রাশেদ খান মেনন রাজবন্দি হয়ে বহুদিন ২০ সেলে ছিল। নতুন বিশের আবার দুইটা গেট। ঐদিকে যাদেরকে রাখতো তারা আবার দেওয়ানীর দিকে আসতে পারতো না। সেখানে ১৭টা মাস আমি উনার একান্ত সান্নিধ্য পেয়েছি। শেষের দিকে আমি উনার একান্ত সচিব, উনার প্রেস সচিব। উনার ডাকপিয়ন, পিডিপি-এনডিএফ যারা ছয় দফার সমর্থন দিলো না তখন তো আমেনা বেগম-মিজান চৌধুরী নেতৃত্ব দিয়েছেন। তখন তাদের প্রতি যে নির্দেশনা সেগুলো সব ক্যারি করতাম। নূরুল ইসলাম সাহেব সহকারী প্রচার সম্পাদক উনিও কারাগারে আসেন নি, দপ্তর সম্পাদক মাহমুদুল্লাহ সাহেব (পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন) উনি, মিজান ভাইও তখন কারাগারে আসেন নি। আমি সকল নির্দেশনা পৌঁছে দিতাম। এই ১৩ মাসের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে উনাকে বোঝা, উপলব্ধি করা, উনার অন্তরের খুব কাছাকাছি যাওয়ার একটা বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলাম। আমি খবরের কাগজ পড়তাম, উনি বলতেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো পড়ো। উনার একটা কাপড়ের ইজি চেয়ার ছিলো। সেই ইজি চেয়ারে শুয়ে উনি এরিন মোর তামাক খেতেন। এতে তিনি খুব সম্মানিত বোধ করতেন। আজকের প্রজন্ম শুনলে বিস্ময়াভিভূত হবে যে, ইকুয়া-ভালভা বলে একটা আফটার সেভ উনি ব্যবহার করতেন এবং খুব বুষ্ট করতেন যে ইনি অর্ডিনারি, আমরা তখন পাকিস্তানি ডিপ্লোমেট ব্যবহার করতাম। ইকুয়া-ভালভা শেষের দিকে আমিও কিছুদিন ব্যবহার করেছি। তখন ডানহিল, ইটারনিটি, আরমানি, গুচি এগুলোর নামই শুনি নি। গোসলের আগ পর্যন্ত উনি লুঙ্গি পরে থাকতেন। সকাল শুরু হতো হাঁটা দিয়ে, এরপর নাস্তা খাওয়া। উনি খেতে বেশি পছন্দ করতেন না, খাওয়াতে পছন্দ করতেন। কখনো আব্বা আসলে ঝিনাইদহ থেকে বেশি করে মিষ্টি, খেজুরের গুড় নিয়ে আসতো।
যখন দেওয়ানীতে ছিলাম তখন ভাবী নানারকমের খাবার পাঠাতেন। আমরা চাইতাম প্রতিদিন ইন্টারভিউ হোক তাহলে আমি প্রতিদিন খেতে পারবো। তখন মোয়াজ্জেম ভাই আসে নি। আমি মুজিব ভাইকে গিয়ে টুক করে বলতামÑ কি পাঠিয়েছে! বেশিরভাগই রেক্সের কাবাব-পরোটা পাঠাতো, গোপালগঞ্জের কই, টক মিষ্টি এরকম অনেক ভালো ভালো খাবার আসতো। উনার জন্য তো ফ্রি ছিলো, কোন সীমাবদ্ধতা ছিলো না। ফালতু’রা টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে উনার  পেছন পেছন আসছে। এরমধ্যে আমরা হয়তো ব্যাডমিন্টন খেলছি বা হাঁটাহাঁটি করছি। পরবর্তীকালে মোয়াজ্জেম ভাই যখন আসলেন কিছুদিনের জন্য, নূরুল ইসলাম সাহেব আসলেন, অস্থায়ীভাবে মেননকেও আমাদের সেলে দিলো, বাকী ভাইকেও সেলে দিলো। যাই হোক, খাবার আসলেই আমি মুজিব ভাইকে বলতাম, ভাবি কি পাঠিয়েছে? উনি বলার পরে আমি বলতাম, এটা আমার মা খুব যতœ করে আমাকে খাওয়াইছিলো। উনি আমার এই আহ্লাদটাকে মেনে নিয়ে বলতোÑ যা যা আমি ফরিদকে (মেট) বলে দিয়েছি, ও তোকে দিবে। তারপরে ওটা ভাগ করে সবাইকে দেবো। মানিক ভাই, নজরুল ইসলাম সাহেবরা যেখানে থাকতো ওখানে খাবার পাঠানো হতো, আবার ওখান থেকেও খাবার আসতো। তো আমি গিয়ে পেট ভরে খেয়ে নিতাম (৫-৭টা কাবাব, ৪-৫টা পরোটা)। এরমধ্যে একদিন খুব মারাত্মক ঘটনা ঘটলো। মোয়াজ্জেম ভাই নতুন বিশে চলে গেছেন। মোয়াজ্জেম ভাইও আমাকে প্রচ- ¯েœহ করতেন। তখন পর্যন্ত তো আমি সবার ছোট। পরবর্তীকালে আরো ছোট এমনকি ক্লাস নাইনে পড়া রফিকও যাকে লিটন কমরেড বলা হতো সেও গিয়েছে। জগন্নাথ কলেজের মফিজ, ফিরোজ, রেজা, আল-মুজাহিদী, ইয়াকুব, সাইফুদ্দিন ফিরোজ ওরা নয়জন ছিলো। আমি যখন গেছি তখন সবাই আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা, আর জুনিয়রদের মধ্যে আমি আর কামরুজ্জামান।
যাই হোক সেদিন রেক্সের কাবাব আর পরোটা পাঠিয়েছে। পিয়াজ, মরিচ দিয়ে আরেকটা আইটেম ফ্রাই করেছে। ওটা আরো মজা হয়েছে। আমি পেট ভরে খেয়েছি। একদম পরিতৃপ্তি নিয়ে খেয়েছি। রাতের বেলা মেট নিয়ে সবার সেলে সেলে দিয়ে আসছে। সবাই খেয়েছে। পরেরদিন সকালে আমরা মর্নিংওয়াক করছি, মুজিব ভাই তখনও আসেন নি। মোয়াজ্জেম ভাই আমাকে বলছেন, কালকে রাত তো ভালোই গেছে তাই না? আমি বললামÑ কি রকম ভালো গেছে? বলেÑ রেক্সের পরোটা আর ডাবল ফ্রাই! উনি একটা মেটকেও বলছে, আমাকে দিয়েছে কিনা। মেট বলতে পারে নি। তো, আমি মুখটা কালো করে, কাচুমাচু করে বলছিÑ না মোয়াজ্জেম ভাই, আমাকে দেয় নি, আমি তো খাই নি! উনি বললেনÑ হোয়াট! ফরিদ মোটামতো দাঁড়িওয়ালা। বঙ্গবন্ধু ওকে বলতো, আলম যা খায় দিস। ফরিদ বিরক্ত হতো যে, তার বস খায় নি অথচ সে খাচ্ছে! স্যার খেলে সে টের পাবে যে কতটুকু আসছে; তারপরে না আমরা খাব। ও মনে মনে বিরক্ত হতো। ওর বিরক্তির ভাব মোয়াজ্জেম ভাই, মুজিব ভাইয়েরা বুঝতো। কখনো ধমক-ধামক দিয়েছে কিনা আমি জানি না। তো, আমার হাত ধরে ধরে টানতে টানতে মুজিব ভাইয়ের কাছে নিয়ে মোয়াজ্জেম ভাই বললোÑ বস, ফরিদরে আপনি এক্ষুণি সরান, ওর এই বেয়াদবি বরদাশত করা যায় না। মুজিব ভাই, ও আমাদের সবচেয়ে ছোট। আমার মনে হচ্ছে গতরাতে আমি বিষ খেয়েছি, গলায় আঙুল দিয়ে বমি করে ফেলতে ইচ্ছে করছে। বঙ্গবন্ধু ভেঙচিয়ে ভেঙচিয়ে বলছেনÑ মোয়াজ্জেম কি হইছে? আহারে আমারও তো খারাপ লাগতেছে! ওরে দেয় নি? আলম, তুমি ওখান থেকে মিয়া সাহেবকে দিয়ে আমাকে খবর দিলা না কেন? আমি তো ঠেসে খাইছি! ওদের ভাগে তো একখান- দেড়খান করে পড়ছে। বঙ্গবন্ধু বললোÑ আহারে মোয়াজ্জেম, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে! তাহলে চিৎকার করে ওরে জিগাইলি না কেন যে, আলম খাচ্ছে কিনা! তারপরে মুজিব ভাই বলেÑ ওই বিড়াল লকআপের আগেই অর্ধেক ফিনিশ করে দিয়েছে। তোমরা তো খালি রিং খেলো আর ব্যাডমিন্টন খেলো; ও কোথায় যায় তার কোন খবর রাখ! আমি গিয়ে বঙ্গবন্ধুর পেছনে লুকিয়েছি, উনি আমাকে মারবেই। মানে উনি তো একটা এপ্রিল ফুল হয়ে গেল। তারপরে তো একদিন কাগজে লিখে চার-পাঁচজন চিল্লায়ে মিছিল করছেÑ আলমের পেটুকগিরি চলবে না, ওর মা যা খাওয়ায় নি তাই জেলখানায় আনা হবে।
পাশে একটা ছাতাওয়ালা বাড়ি আছে। আমরা বলতাম আমব্রেলা হাউজ। হাসপাতাল থেকে বাড়িটি দেখা যেত। আমি আর মোয়াজ্জেম ভাই হাসপাতালে ভর্তি। আমাদের বয়সের তফাৎ অনেক। মোয়াজ্জেম ভাই আমাকে বলছেÑ ঐ দ্যাখ একটা মেয়ে দেখা যায়। আমি বললামÑ ধুর মোয়াজ্জেম ভাই, দেখতে ভালো না। সে বললোÑ জেলখানা থেকে রমণীমুখ, ভালো আর মন্দ কি! জেলখানায় তুমি কি সুন্দরী সুচিত্রা সেনকে দেখবে! জেলখানায় আসলে বয়সের পার্থক্যটা থাকে না। তখনও বোধহয় মোয়াজ্জেম ভাই বিয়ে করেনি।
এটা আমার গুড হ্যাবিটস না, একটা ম্যানিয়া মতো হয়ে গিয়েছিলো যে, ছাত্ররাজনীতির সময় কঠিন দুর্বোধ্য বই না পড়লে আমার মেন্টাল কনজাঙ্কশন হতো না। আমি স্বজ্ঞানেও বেশ একটা বুদ্ধিজীবী বুদ্ধিজীবী ভাব দেখাতাম। পরবর্তীকালে এটা আমার জন্য বুমেরাং হয়ে উঠেছিলো। জেলখানায় এটার অনেক অ্যাডভান্টেজ পেয়েছি বিশেষ করে নেতার কাছ থেকে। পরবর্তীকালে আমি যারা সো-কল্ড তাত্ত্বিক, মানে বেশি বোঝার দলে ঢুকে যাওয়ার মতো অবস্থা; অকথ্য ¯েœহের কারণে ফেরদৌস ভাইদের মতো অবস্থা হয় নি। পেপারে কোন গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেলে বা বইতে কোন ইম্পর্টেন্ট কিছু পেলে আমি গিয়ে নেতাকে দেখাতাম। তখনকার দিনে জেলখানার লাইব্রেরিও খুব সমৃদ্ধ ছিলো। সেখান থেকে বই পড়ে যেখানটায় আমি মনে করতাম আমাদের রাজনীতির সঙ্গে যোগসাজশ আছে, আমি নিয়ে নেতাকে তা পড়তে দিতাম। যেমনÑ জহরলাল নেহেরুর অটোবায়োগ্রাফী, মহাত্মা গান্ধীর জীবনী, সহিংস ঘটনার পরে আন্দোলন প্রত্যাহারের অংশ, তারপরে খাদি আন্দোলন, রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে গিয়ে তিনি ম্যানচেস্টারে থাকতে চাইলেন এবং তার কারণ হিসেবে তিনি বললেন দ্যাখোÑ আমি যে চরকা করতেছি এই চরকা কিন্তু প্রতীকী নয়। আমি এই চরকা গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দেব। তোমাদের মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। তখনকার ৫০ কোটি লোকের বাজার শেষ হয়ে যাবে। এইরকম  একটি বক্তৃতাও তিনি করেছিলেন। এই সমস্ত টুকিটাকি ঘটনা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেভাবে রেনেসাঁস ডেভেলপ করলো, যেভাবে গণতান্ত্রিক  চেতনার বিকাশ হলো, যেভাবে জাতীয়তাবাদী, বিপ্লবীদের কাছে স্বাধীনতাবাদীদের চাইতে সা¤্রাজ্যবাদীদের বাম রাজনীতি নৈকট্য লাভ করে। এবং সেই কারণেই বস আপনি যখন ছয় দফা দিয়েছিলেন তখন ডান যেমন আপনার বিরোধিতা করছে, বামও আপনার সমর্থন করে নি; এসব বিষয় নিয়ে আমরা ডিবেট তৈরি করতাম। সেখানে এইসব তাত্ত্বিক আলোচনা করতাম। তিনি খুব পছন্দ করতেন। মোয়াজ্জেম ভাই তখন প্রতিষ্ঠিত অ্যাডভোকেট। আমি ল’র ছাত্র, পাস করি নি তখনো। একটা মামলা নিয়ে তিনি বলতেনÑ তুমি ডিফেন্সে, তুমি প্রসিকিউশনে। উনার বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হতো তার বৃত্তান্ত বলতেন। জেলগেটে তার বিচার হতো। এসে বলতেন কি কি সওয়াল জওয়াব হতো। আবার আমাদেরকেও  বলতেন তোমরা এর উপর সওয়াল জওয়াব করো। এভাবেই দিনগুলো কেটে যেত।
বঙ্গবন্ধুর একটা সম্মোহনী শক্তি ছিলো। দারুণ একটা আকর্ষণীয় শক্তি ছিলো। একবার চিত্তদা’র সঙ্গে একটা ঘটনায় পুরোপুরি আমারই দোষ ছিলো। পরে আমি ক্ষমা চেয়েছি। হঠাৎ, আই লস্ট মাই টেম্পার।
তখন আমাদের একটা দাবি ছিলো। যখন ইনস্পেকশন হবে তখন ফাইলে নিতে হবে। সেলের মধ্যে যারা ছিলো তাদেরকে বলে দেয়া হতো। আর যারা সেলের বাইরে ছিলো তাদের হাতটাকে এইভাবে রেকে বসে থাকতে হতো। হাঁটুর উপর গেড়ে বসে হাতটা সামনে দেয়া হতো। সেখানে আমরা বললাম যে, সেলে যাব না। তবু আমাদেরকে তো সেলে নিতোই। ধস্তাধস্তি তো আর করা যেত না। সেলে নেয়ার জন্য ওখানে এনায়েতউল্লাহ (তখনকার ডিআইজি), ফরিদ সাহেব (জেলার), তোফাজ্জল, নির্মল বাবু এরা ডেপুটি জেলার; আমাকে বুদ্ধি দিয়ে দিলো সবাই যে, তোমাকে ডিআইজিকে বেইজ্জতি করতে হবে, অপদস্ত করতে হবে। একে তো নাচুনী বুড়ি তার উপরে ঢোলের বাড়ি। তো জেলের যে ফটকে বরাবর এসে উনি দাঁড়াতেন। ওখানে এসে জিজ্ঞেস করতেনÑ কেমন আছেন, কি বৃত্তান্ত। আমরা কেউ শোয়া অবস্থায়, কেউ বসা অবস্থায়। আমাদের কোন অনুযোগ-অভিযোগ আছে কিনা সেটা জিজ্ঞেস করতেন। সেটা মূলত জেলে আমাদের যিনি প্রতিনিধি ছিলেন তিনিই ফয়সালা করতেন। মূলত এটা সৌজন্য সাক্ষাৎ। সেখানে আমাকে বলা হয়েছে, উনি আসলে আমাকে ফটকের সামনে একটা টেবিল দেয়া হবে, আমি চেয়ারে বসে টেবিলে পা তুলে রাখবো, মুখের উপর সংবাদপত্র ধরে রাখবো। উনি কোন প্রশ্ন করলে আমি কোন উত্তর দেব না; শুধু পা নাচাব। যথা পরিকল্পনা তথা কাজ। বঙ্গবন্ধুকে উনারা সবাই স্যার ডাকতেন। তখনকার মুজিব ভাই, শেখ সাহেব। তো ওখান থেকে ফিরে যাওয়ার সময় মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করলেন। তো মুজিব ভাই বললেনÑ কি ডিআইজি সাহেব, কেমন আছেন? মুজিব ভাইকে উনারা স্যার ডাকতেন। মুজিব ভাই একটা ডেপুটি জেলারকেও স্যার বলে ডাকতেন। আমরা খুব বিরক্ত হতাম। আমাদের এগুলো পছন্দ হতো না। তবে বেশকিছু ডেপুটি জেলারÑ শামসুর রহমান সাহেব, তফাজ্জল সাহেব, নির্মল বাবু উনাদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা খুব বেশি ছিলো। এনায়েতউল্লাহর সঙ্গে আমি এই বেয়াদবিটা করার পর উনি গিয়ে নালিশ করে দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর কাছে। বলেছে যে সিদ্দিকী সাহেব আমাকে এইভাবে অপদস্ত করলো। উনি একটা কথা বলেছে, উনার জেলার, ডেপুটি জেলাররা বোধহয় বিস্তারিত কথাবার্তা বলেছে। উনি চলে যাওয়ার পর লকআপ ফ্রি হয়ে গেল মানে ফাইল শেষ হয়ে গেল। আমি তো বীরোচিত ভাবসাব নিয়ে আছি। সেলের উপর তো রাজবন্দিদের আর কোন পানিশ্মেন্ট নাই। আমি তো সর্বোচ্চ পানিশমেন্টেই আছি। এই সেল তো অন্যরকম সেল হয়ে গেছে মুজিব ভাইয়ের উপস্থিতির কারণে। সেখানে আমি গিয়েছি, গিয়ে বলিÑ মুজিব ভাই, দিছি হালারে হান্দায়ে! এরকম দুই তিনবার বলার পরে উনি পেপারটা নামিয়ে কষে একটা ধমক মারলেনÑ বেয়াদবি করার ভেতর কোন বাহাদুরি নেই। বেয়াদবির কোন সুপরিচয় আছে? সে তো বাপের বয়সী লোক, তুমি তার সামনে পা নাচিয়েছো, এটা তোমাকে কোন খ্যাতি দেবে না; আমি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাতে গড়া, সোহরাওয়ার্দী পরিবার গোটা ভারতের মধ্যে মুসলমানদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত পরিবার, সেই সোহরাওয়ার্দী সাহেবও তার বাসার কাজের লোককে আপনি বলে ডাকতেন, কার্টেসি শেখো, মানুষকে সম্মান না করলে সম্মান পাওয়া যায় নাÑ এটা বুঝতে শেখো। আমি তো একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। যারা তো আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে তারা তো রণে ভঙ্গ দিয়ে দিয়েছে। আমার দুর্গতি দেখে ডানে-বাঁয়ে আর কেউ নেই। আমি একা একেবারে তোপের মুখে পড়ে গেছি। আমার যতদূর মনে পড়ে প্রায় দুই দিন উনি আমার সঙ্গে কথা বলেন নি। অনেক অনুনয়-বিনয় করে, প্রতিজ্ঞা-শপথ করে বলছি যে, আমি আর কখনোই বেয়াদবি করবো না। কে জানে যে, ডিআইজির সঙ্গে এমন করার পর তিনি ব্যাপারটাকে এভাবে নেবেন। তিনি তো ছিলেন আমাদের স্বপ্নের মহাপুরুষ। সেটা তো আমাদের জন্য অলঙ্ঘনীয় ছিলো। তিনি শুধু যে আমাকে বকা দিয়েছেন সেটা নয় এবং বকা দেয়াটা যে যথার্থ ছিলো সেটা পরবর্তীতে আমি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি। পরবর্তীতে আর কোনদিন আমি জেলের কারো সঙ্গে বেয়াদবি তো করিই নি বরং চেষ্টা করেছি মুজিব ভাইকে অনুসরণ করতে।
মমতাজ উদ্দীন সাহেব, তখনকার সিভিল সার্জন নামটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। উনি আমাদেরকে খুবই সম্মান করতেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু বয়সে তার সমান সমান বা বয়সে একটু ছোট হলেও সত্যিকারের মুরব্বির এবং নেতার সম্মান দিতেন। ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের সিভিল সার্জন, তিনি তখন ডিআইজি বা সুপারের র‌্যাংক নিয়ে জেলখানায় ঢুকতেন। উনি যদি বলতেনÑ কাশ্মীরের আঙুর লাগবে এবং আফগানিস্তানের আখরোট লাগবে এটাই জোগাড় করতে হতো। তখন আমাদের স্কেল ডায়েট ছিলো। ৫-৭ টাকা দিন নয়। চিনি, একটু গোশ্ত, একটু মাংস, একটু ডাল। এটাকে আবার বাটার করা যেত। একটার সঙ্গে আরেকটা বদলানো যেত।  এর সঙ্গে মেডিকেল ডায়েটটা যোগ হতো। পরে আমাদের ইনচার্জ মেন্যু ঠিক করতো। তো, শহীদুল্লাহ উনার কাছে আঙুর না নাশপাতি কি যেন ডায়েট পাস করার কথা বলেছিলো। মমতাজ সাহেব বুঝতে পারে নি যে রাজবন্দি তো রাজবন্দিই। মানিক মিয়া যা, শহীদুল্লাহও তাই। যদিও মানিক মিয়ার স্ট্যাটাস অনেক উঁচু ছিলো।
মমতাজ সাহেব বলে ফেলেছেনÑ বাইরে পাকা আমড়া খান নি, এখানে এসে আঙুর খেতে চান। এই কথা মানিক ভাইয়ের কানে গেছে, আমি শুনেছি। কখনো আমি ১০ সেলে যাই নি। ওখানে যে তাস খেলাটা হতো সেখানে উনি পাশে বসে মজা করতেন, রস করতেন। উনি সবার মুরব্বি। উনি যে ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন এটা মমতাজ সাহেব টের পান নি। সেই মন্তব্য করার সঙ্গে সঙ্গে মানিক ভাই বাঘের মতো গর্জন করে বলে উঠলেনÑ ‘এই, মোনায়েম খানের দালাল। পিঠের চামড়া তুলে দেবো। তুমি ভাবছো অনন্তকাল ধরে আমরা জেলে থাকবো? আমি তোর কবর থেকে হাড় তুলে তোরে পিটাবো; বেয়াদবের বাচ্চা। বাংলাদেশের জন্য, ছয় দফার জন্য জেলে এসেছে; আর সে বাইরে আমড়া খেতো নাকি তরমুজ খেতো এই বলে তাকে খোটা দিবা!’ সবাই ধরে-টরে মানিক ভাইরে শান্ত করছে। আমি যে ডিআইজির সঙ্গে বেয়াদবি করছি এটা সেই ঘটনার পরে। আমি সেদিন সৌভাগ্যক্রমে মুজিব ভাইয়ের কাছে বসে আছি। মমতাজ সাহেব হন্তদন্ত হয়ে এসে মুজিব ভাইয়ের কাছে নালিশ দিলো। শোনার পরে মুজিব ভাই খুবই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, স্বভাবসুলভ চরিত্রে বললোÑ মানিক ভাই এতো চেতা চেতলো, আপনারও কপাল খারাপ, মানিক ভাইয়ের সামনে গিয়ে কথাটা বলে ফেলছেন। তো, মমতাজ উদ্দীন সাহেব, আমি খুবই দুঃখিত। তবে একটা জিনিস কি জানেন, হাইকোর্টের মামলা তো জজকোর্টে হয় না! মানিক ভাই আপনারে গালি দিয়েছে এটা আমি শুনেছি এ কথা মানিক ভাই শুনলেও তো আমারে একটা গালি দেবে। ভালো-মন্দ আমার কিছু করার নেই, অনতিবিলম্বে মানিক মিয়ারে গিয়ে ঠা-া করেন। না হলে এটার জের অনেকদূর গড়াতে পারে। আপনি ভাই ফাউল করে ফেলছেন। এটা যদি আলম হতো আমি একটু বকে দিতাম, যদি মোয়াজ্জেম হতো তাহলেও আমি একটু বকে দিতাম। মানিক ভাইয়ের নামে তো আমি মামলা নিতেই পারি না, বিচার করবো কি!
মুজিব ভাই মানিক মিয়াকে মানিক ভাই ডাকতেন। মুজিব ভাইকে মানিক ভাই মুজিবর মিয়া বলতেন। মানিক মিয়াকে তিনি অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। মত-পার্থক্যের পরেও যে একটা গভীর বিশ্বাস এবং পূর্ববাংলার স্বার্থের প্রশ্নে যদি কেউ আপোষহীন থাকে সেটা হলো তার নেতা সোহরাওয়ার্দীর পরে এই বিশ্বাসটা অক্ষত রেখেছিলেন মুজিব ভাই। দীর্ঘদিন যাবৎ ছয় দফা দেয়ার আগে আমি তো মানিক মিয়া-সিরাজুদ্দীন হোসেনেরই সাগরেদ। তখন আমি বঙ্গবন্ধুর চেয়ে অনেক বেশি সময় এই দুইটা লোকের সঙ্গে কাটিয়েছি। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মৃত্যুর পর আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গিয়ে জগন্নাথ কলেজে গিয়ে বক্তৃতা দেই। উনিও ওখানে বক্তৃতা করলেন। সিরাজ ভাই প্রধান অতিথি। সেখান থেকেই আমি উনার নজরে আসি। তারপর উনার এবং মানিক ভাইয়ের সান্নিধ্যেই বড় হয়েছি। মুজিব ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন সিরাজ ভাই। বেকার হোস্টেলে থাকাসহ অনেক স্মৃতি সিরাজ ভাই করেছেন মুজিব ভাই সম্পর্কে। সিরাজ ভাই এবং মানিক ভাইয়ের ধারণাÑ মুজিব ব্যতীত অন্যান্য নেতারা যে যত কথাই বলুক স্বার্থের গন্ধ পেলে ওখান থেকে স্লিপ কাটবে। এর মধ্যে ঘনিষ্ঠভাবে মানিক ভাই-আশ্রয়ী কিছু নেতা ছিলেন। যারা মনে করতেন মানিক ভাই-ই তাদের একমাত্র অভিভাবক। মানিক ভাই তাদেরকে সমর্থনও দিয়েছেন এবং অনেক সময় তাদের সাহায্য-সহযোগিতাও করেছেন। কিন্তু যখন মুজিব ভাই বনাম অন্যদের প্রসঙ্গে কথা আসতো তখন মানিক ভাই বলতোÑ এই ব্যাটারা শুধু ড্রয়িং রুমে বসে বসে কথা কয়; এটা মারায়, ওটা মারায় কিন্তু কাজের সময় এক শালা ময়দানে থাকে না, সব নেংটি ইঁদুরের মতো দৌড় দেয়। আর জেল খাটার সময়ও এই মুজিবর মিয়া, জুলুম সহ্য করার সময়ও মুজিবর মিয়া আর ভাগ নেয়ার সময় সব শালার নেতারা পায়জামা পরে বসে পড়ে।
মানিক ভাই প্রচ-ভাবে উদারচেতা নেতা ছিলেন। আমি যখন বেরিয়ে আসলাম ২৪শে জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানের পরে তখন আমাকে অত্যন্ত ¯েœহে রাজনীতিতে লালন করেছেন সৈয়দ মোজহারুল হক বাকী। আমার যতটুকু অবস্থান তার প্রাথমিক কৃতিত্ব আমি যে দুজনকে দেবো তারা হলোÑ সৈয়দ মোজহারুল হক বাকী এবং সিরাজুদ্দীন হোসেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুসহ আরো ৩০-৩৫ জন নিয়ে উনি আমাকে রিসিভ করলেন। আমরা ঐটুকু রাস্তা হেঁটে আসলাম। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি জেলে যাওয়ার আগে ছাত্রলীগের মধ্যে অন্তত আমার অবস্থানটা একটু হলেও করেছিলাম। কিন্তু জেলখানাতে বিতর্কে অংশগ্রহণ নেই নি দু-একটা তা নয়, কিন্তু শহীদ মিনারে সব হল থেকে দু-একশ’ লোক এসেছে; আমি মুক্তি পেয়েছি আমাকে দেখতে। আমি কিন্তু বক্তৃতা করতে পারলাম না। আমার সেই কণ্ঠ নেই,  সেই ভাষা নেই, সেই আবেগ নেই, সেই উচ্ছ্বাস নেই, আমার উদ্বেলিত হৃদয় নেই, চোখে বিদ্যুতের ঝিলিক নেই। বাকী ভাই একেবারে নিষ্প্রভ হয়ে গেল কারণ ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার কথা; আমি উনাদের ক্যান্ডিডেট। এমনকি আমার মনে হয় মানিক মিয়াও খুব নিরাশ হয়ে গেছে। তবে আমি চর্চা করতে করতে আগের জায়গায় চলে এসেছি। শহীদ মিনার থেকে সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে কিছুক্ষণ থেকে ধানমন্ডি ২৩ নম্বরে মানিক মিয়ার বাসায় এসেছি। গিয়ে সালাম করলাম। বঙ্গবন্ধু তো তখন জেলে আগরতলায়। মানিক ভাই বারবার আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে বলছে, নিউজটা দেখো, নিউজটা দেখো। আরে অলি আহাদ, মনি সিং এরা তো কেউ ১৫ দিন, কেউ ৩ মাসের রাজবন্দি। আর আলম তো ৬৬’র জুন থেকে। একেবারে তারিখ উল্লেখ করে নিউজ করো। এই যে আমার দীর্ঘদিনের কারাবাস এবং দীর্ঘদিন আমি সেখানে ছিলাম। তখন তো অনেকেই জেলে গেছে, গণঅভ্যুত্থানের পরে বেরিয়ে গেছে। সেখানে একটু আগে আমার বাবারে ভীষণভাবে গালি দিয়ে বিষম ছুটিয়ে দিচ্ছে। তারপরে আমার নিউজটা তারিখসহ যাচ্ছে কিনা সেটার দিকেও পুরো নজরদারি করছে। আমি তো ন্যূনতম একটা কর্মী। ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা ইত্তেফাকে গেলাম। যারা ছিলো সবার সঙ্গে দেখা হলো। আমি সিরাজ ভাইকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলাম। আমি তখন মানিক ভাই, মুজিব ভাই, সিরাজুদ্দীন হোসেন এই তিনজনকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতাম। তখনকার দিনে শিক্ষকদের মধ্যে আমি সাইদুর রহমান সাহেবকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতাম। আর মনে মনে অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্মান করতাম, শ্রদ্ধা করতাম।
আমার পুরো রাজনীতিটাই ছিলো একটা কর্মসূচিভিত্তিক, একটা আদর্শভিত্তিক, একটা চেতনাভিত্তিক। এটা হঠাৎ করে জাগা কোন মানসিকতা থেকে নয়। বা এটা করলে ডাকসুর ভিপি-জিএস হতে পারবো, ছাত্রলীগের নেতা হবো; এটা কিন্তু আমার চিত্তকে কখনোই প্রভাবিত করেনি। আমি একটা চেতনার দ্বারা লালিত হচ্ছিলাম কিন্তু সেই চেতনার মধ্যে গণতান্ত্রিক চেতনা, বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা, সশস্ত্র অবস্থায় এটাকে কখনোই করা যাবে না। জেলখানায় পড়ে-টড়ে গান্ধীর খাদি আন্দোলন, সুশৃঙ্খল অহিংস আন্দোলন এটাও মানুষের মনের উপর প্রভাব বিস্তার করছে। সমাজতান্ত্রিক সশস্ত্র আন্দোলনের প্রতি বিদ্বেষ। আমার মনের যে প্রতিক্রিয়া সবকিছুই রাজনৈতিক, এখানে ব্যক্তিগত কোন ব্যাপার ছিলো না।
আমরা জেলখানা থেকেই ফিল করেছি; তখন তো বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জেলখানায়। কুর্মিটোলায় উনি। তখন কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের রেশ, আন্দোলনই শেষ কথা কিন্তু ওখানে সন্ত্রাস, নির্বাচনের আগে বিপ্লব এগুলো আমাদের চেতনাকে স্পর্শ করতে পারে নি। তবে ঐটুকু কিন্তু স্পর্শ করেছে যেÑ আন্দোলনই শেষ কথা। যেমন চৌরিচাড়ার ঘটনার পরে গান্ধীজি আন্দোলন প্রত্যাহার করলেও আন্দোলন পরবর্তীকালে দানা বেঁধেছে। তবে চিন্তা- চেতনার উপর যৌবনের তো একটা দাবি থাকে। আমাদের কেন জানি মনে হতো বঙ্গবন্ধু প্যারোলে গেলে আন্দোলনটা স্তিমিত হয়ে যাবে, আন্দোলনটা থেমে যাবে।
সিরাজুদ্দীন হোসেন বা মানিক মিয়াকে আমি ভালোবাসতাম বা ফলোয়ার ছিলাম আমি এই কারণে যে, চিন্তার এতো সাবলীল স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক চিন্তার এতো সুশৃঙ্খল অবস্থান তাদের হৃদয়ে; মানুষ তো একটা ভালো বিশেষণ পেলেও খুশি হয়, নারায়ণগঞ্জের এক সংবর্ধনা সভায় মানিক মিয়াকে কমরেড লাল সালাম বলার সঙ্গে সঙ্গে উনি রিঅ্যাক্ট করে বলেছেনÑ স্টপ ইট! সিরাজুদ্দীন হোসেন, মানিক মিয়া একদিনের জন্যও নিজেদেরকে কমরেড ভাবেন নি। এবং তাদের অনুরাগী-অনুসারী হওয়াতে এবং সেই অনুশীলন মনের মধ্যে ছিলো বলে আমরাও কিন্তু রাজনৈতিক চেতনার প্রশ্নে এতটুকু আপোষ করা যায়, এতটুকু সরে আসা যায় সেই সুবিধাবাদী অবস্থাটা আমাদের মধ্যে ছিলো না।

LEAVE A REPLY