বাংলাদেশের শিশুদের ব্যাপকভাবে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হবার মধ্যেই রাজধানী ঢাকাসহ কিছু এলাকায় বড়দের বা প্রাপ্তবয়স্কদের হামে আক্রান্ত হবার খবর পাওয়া যাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় হাসপাতালে হামে আক্রান্ত বড়দের চিকিৎসার জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্করা কেন হামে আক্রান্ত হচ্ছে? বড়দের অর্থাৎ কুড়ি বছরের বেশি বয়েসিদের মধ্যে যারা হামে আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ আছে কি-না?বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শিশুদের জন্য যতটা উদ্বেগের, বড়দের জন্য তা নয় বলেই মনে করেন তারা। এদিকে দেশে গতকাল রোববার পর্যন্ত হাম উপসর্গ নিয়ে ৪৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বাংলাদেশে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই হাম ভয়াবহ আকার ধারণ করতে শুরু করেছিল। এজন্য গত কয়েক বছরে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়াকেই বড় কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগ গত মাসের শেষ দিকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সংস্থাটি বাংলাদেশে হামের টিকার তীব্র ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান মৃত্যুহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ঢাকার কয়েকটি হাসপাতালে বড়রাও হামের উপসর্গ নিয়ে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে সংবাদ মাধ্যমে এসেছে, যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে যে, বড়দের হামে আক্রান্ত হবার রিপোর্ট তাদের কাছে যায়নি। বিশেষ করে ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতাল ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে বড়রাও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার খবর দেশের সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
ঢাকার বাইরেও কয়েকটি জায়গায় কুড়ি বছরের বেশি বয়েসিদের হামে আক্রান্ত কিংবা হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির খবর পাওয়া গেছে। রংপুরের সিভিল সার্জন শাহীন সুলতানা জানিয়েছেন রংপুর বিভাগে এমন রোগীর সংখ্যা ছয় জন এবং তাদের হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেছিলেন, তবে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে বয়স্কদের হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার ঘটনা নেই। রংপুরে বড়দের মধ্যে যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলছেন, বড়দের মধ্যে যারা হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের অবস্থা গুরুতর নয় এবং যথাযথ চিকিৎসায় তারা সেরে উঠছেন। তিনি বলেছেন, ৫/৬ জন এখন চিকিৎসাধীন আছেন। তবে বয়স্কদের মধ্যে যাদের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে তাদের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। আমরা শিশুদের চিকিৎসা নিয়ে সর্বোচ্চ কাজ করছি। ঢাকার হামের চিকিৎসার জন্য মহাখালীতে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে শিশুদের জন্য পৃথক ওয়ার্ডের পাশাপাশি বার বছরের বেশি বয়েসিদের জন্য ‘ইনফেকশাস ব্লক’ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের উপপরিচালক সৈয়দ আবু আহাম্মদ শফি বলছেন, বড়দের সাধারণত শিশুদের তুলনায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে এবং সে কারণেই তাদের হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা কম থাকে। তিনি বলেছেন, তবে নানা কারণে কারও শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে তিনিও শিশুদের মতো একই ভাবে হামে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে সাধারণত বড়রা চিকিৎসায় সহজেই সেরে ওঠেন। তবে ঢাকায় আমরা এখনো বড়দের হামে আক্রান্ত হওয়ার রিপোর্ট পাইনি।
তিনি বলেন, অন্য রোগের কারণে যারা দুর্বল, যারা ক্যান্সার বা এ ধরনের রোগে আক্রান্ত কিংবা কোনো রোগের চিকিৎসার জন্য স্টেরয়েড নিতে হচ্ছে, যারা টিবি বা যক্ষ্মায় আক্রান্ত এবং সর্বোপরি হার্ড ইমিউনিটি কমে গেলে যে কেউ হামে আক্রান্ত হতে পারে।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ভ্যাকসিন নলেজ প্রজেক্টের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, যখন একটি এলাকার বেশিরভাগ মানুষকে কোন একটি সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক দেয়া হয় তখন ওই এলাকায় ওই রোগটির ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে না। কারণ ওই এলাকায় আর সংক্রমিত হওয়ার মতো মানুষই থাকে না। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, একটি সম্প্রদায়ের কারো মধ্যে যদি হাম দেখা দেয়, আর বেশিরভাগ মানুষের যদি টিকা দেয়া থাকে তাহলে ওই রোগটি আর কারো মধ্যে ছড়াতে পারে না। এটাই হার্ড ইমিউনিটি বা কমিউনিটি ইমিউনিটি।
এর কারণে নবজাতক শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থ মানুষ যাদেরকে টিকা দেয়া সম্ভব নয় তারা রোগমুক্ত থাকেন। কিন্তু এখন ব্যাপকভাবে হাম ছড়িয়ে পড়ার কারণে হার্ড ইমিউনিটি আর কার্যকর নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। আর সে কারণেই শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও হামে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনেকে মনে করেন।






