বিক্ষোভ, প্রতিবাদ আর বিপ্লবের মাতাল হাওয়া ২০২৫ সালকে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ যুগসন্ধিক্ষণে এনে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অসমতা এবং অর্থনৈতিক সংকট, অন্যদিকে নতুন এক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জেন-জির উত্থান। তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে বহুমাত্রিকভাবে ব্যবহার করে নতুন পৃথিবী গড়ার প্রয়াসে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিদায়ের ধারাবাহিকতায় নেপাল, কেনিয়া, মাদাগাস্কার, মরক্কো, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনস উত্তাল হয়েছে। এ যেন নতুন করে আরব বসন্তের লু হাওয়া বইতে শুরু করেছে এশিয়া ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বে। তবে এই দেশগুলোর প্রতিবাদ কেবল স্থানীয় অস্থিরতার প্রকাশ নয়, এখানে একটি বৈশ্বিক আন্দোলনের লক্ষণ সুস্পষ্ট। সবাইকে অবাক করে দিয়ে একটি প্রজন্ম তার নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে সৃষ্ট বিপর্যয়কে শুধরে নেওয়ার জন্য ফিনিক্স পাখির মতো উঠে দাঁড়িয়েছে।
স্বাভাবিক দৃষ্টিতে প্রতিবাদ মনে হলেও জেন-জির এই প্রতিবাদগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি গভীর চেতনা। বিশ্বব্যাপী সমতা, ন্যায্যতা ও শাসনব্যবস্থার সংস্কারের প্রতি তাদের অঙ্গীকার। এরা যেভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহার করে তাদের শক্তিকে ছড়িয়ে দিচ্ছে, তা দেশের রাজনৈতিক সীমান্ত পেরিয়ে অন্য অনেককে অনুপ্রাণিত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে। তারা সমতার দাবিকে শুধু নিজ দেশে সীমাবদ্ধ রাখছে না, বরং পৃথিবীজুড়ে একটি বৈশ্বিক সংহতির সৃষ্টি করছে। মানবাধিকার, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং গণতন্ত্রের প্রতি তাদের নিবেদিত মনোভাব প্রকাশ থেকে অনুমান করা যাচ্ছে বৈশ্বিক রাজনীতির পট পরিবর্তনের। কারণ জেন-জির প্রতিবাদ শুধু প্রতিবাদ নয়, এটি এক নতুন চিন্তার সঞ্চার, এক নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনকে এই আন্দোলনের সূচনাবিন্দু বলা যেতে পারে। তবে শ্রীলঙ্কায় গণবিদ্রোহের কথাটাও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তারপর ২০২৫ সাল বিশ্বরাজনীতিতে নিয়ে এসেছে এক প্রতিবাদের ঘূর্ণিঝড়। এরই মধ্যে ইতিহাসে ‘প্রতিবাদ বছরের’ নামে খ্যাত এই বছরে নাইরোবি থেকে কাঠমান্ডু পর্যন্ত জেন-জির নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্য দিয়ে স্মৃতিচারণের গালগল্প আর ইতিহাসের পাঠে অনাগ্রহী প্রজন্মটি হয়ে উঠেছে নতুন আরেক ইতিহাসের রচয়িতা।
অর্থনৈতিক পতন, মহামারি ও জলবায়ু সংকটে ক্ষতবিক্ষত এক পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া এই ডিজিটাল নেটিভদের বয়স এখন প্রায় ১৩ থেকে ২৮ বছর। এখন তারা মিম কিংবা ভাইরাল চ্যালেঞ্জে তৃপ্ত না হয়ে দুর্নিবার আন্দোলনে ভেঙে ফেলছে দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থা। তারা নতুন নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি বৈশ্বিক একাত্মতার সংজ্ঞা আবার রচনা করছে। এজন্যই হয়তো খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। জেন-জি আগুনঝরা প্রতিবাদ করছে ইজরাইলের বর্বর গণহত্যার মদতদাতা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্লজ্জ কর্মভূমিকার। গ্রেটা থুনবার্গের মতো কিশোরীরা ‘সুমুদ ফ্লোটিলা’ নিয়ে হাজির হচ্ছে গাজা উপত্যকায়।
অ্যান্টানানারিভোর ব্যারিকেড থেকে রাবাতের গ্যাস গ্রাস করা চত্বর পর্যন্ত জেন-জির প্রতিবাদ আর বিচ্ছিন্ন অসন্তোষের উদ্রেক নয়, বরং এটি একটি তীব্র পরিবর্তনের স্রোত হিসেবে ধেয়ে আসছে। এরা একটি ‘নতুন পৃথিবী’ সৃষ্টি করছে যেখানে তরুণদের সম্মিলিত শক্তি প্রতিষ্ঠিত স্বৈরশাসকদের ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে। যখন আমরা এই ঢেউটির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, তখন মাদাগাস্কার থেকে সেনারা প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। এদিকে নেপালে গ্রেপ্তার উপেক্ষা করেও প্রতিবাদ ও গণপ্রতিরোধ চলছে। এর থেকে এটি স্পষ্ট, এই প্রতিবাদ শুধু বিদ্রোহের জন্য নয়, বরং গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও সমাজের একটি পরিকল্পিত নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রচেষ্টাও।
কী এক চিত্তাকর্ষক শক্তি এই যুদ্ধে তাদের প্রবৃদ্ধিকে দৃশ্যমান করছে! এর মূলে রয়েছে একটি গভীর অনুভূতি। আর শাসকচক্রের পক্ষ থেকে ইতিহাসের ঘ্যানঘ্যান-প্যানপ্যান কিংবা স্বজন হারানোর বেদনা টাইপ কিছু সামনে রেখে করে যাওয়া সীমাহীন বিশ্বাসঘাতকতা। জন্মের পর থেকেই তারা এমন একটি পৃথিবী পেয়েছে, যেখানে সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিকে গিলে খেয়েছে ইতিহাসের কিছু গালগল্প। ক্ষমতাধর শাসকের প্রতিটি কথা এখন নিছক মিথ্যা। কারণ নেপালের মতো (২০.৮ শতাংশ) অনেক দেশে যুবকদের বেকারত্ব পৌঁছেছে কল্পনার বাইরে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াল থাবা। যেমন, ফিলিপাইনে বন্যা কিংবা মাদাগাস্কারের ঘূর্ণিঝড় তাদের অশান্তি যেমন বৃদ্ধি করেছে






