মিয়ানমারের কাছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ৮ লাখ ৮৪ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর তালিকার জবাবে যাচাই করেছে মাত্র ৪২ হাজার জনকে

পয়লা ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের দিক থেকে বড় ভয় ছিল, আবার না জানি তারা রাখাইন প্রদেশের বাদবাকি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়। এই আশঙ্কায় বাংলাদেশ তার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। ঘটনাক্রমে এই লেখক তখন টেকনাফ হয়ে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যাচ্ছিলেন। পয়লা ফেব্রুয়ারি দুপুরেও সেন্ট মার্টিনের কাছে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর কোনো জাহাজ দেখা না গেলেও ২ ফেব্রুয়ারিতে নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ এবং কোস্টগার্ডের একটি গানবোট পাহারায় থাকতে দেখা যায়। টেকনাফের বাংলাদেশ সীমান্ত জেটিতেও বিশেষ পাহারা দেখা যায়। ভয় ছিল যে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা বিক্ষুব্ধ জনতাকে ভাগ করতে আবার কি রোহিঙ্গা কার্ড খেলবে? আবার কি বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সমস্যা খালাসের উঠান হতে হবে?

কিন্তু যা কেউ কেউ ভেবেছিলেন, বিষয়টা সেভাবে এখনো দৃশ্যমান হয়নি। বরং জানা যাচ্ছে অন্য কথা। সামরিক অভ্যুত্থানের পরপরই নতুন সামরিক শাসকেরা মিয়ানমারে অবস্থানরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে তাঁরা সামরিক অভ্যুত্থানের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে বলেন কীভাবে নভেম্বর ২০২০-এর নির্বাচনে সু চির দল এনএলডি বিপুল কারচুপি করেছে ইত্যাদি।

চিঠিটির সম্পূর্ণ বয়ান বাংলাদেশ পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশ করেনি। তবে রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে সেখানে যা বলা হয়েছে, তাতে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। সাংবাদিকদের কাছে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘এসব ভালো খবর। এটা এক সুন্দর সূচনা’।

স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে এ ধরনের সুন্দর অনেক সূচনাই অতীতে হয়েছে, যাদের পরিণতি অসুন্দর হয়েছে। কিন্তু এই দফায় চিঠির ভাষার বাইরেও আরও কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যমে এসেছে যে রাখাইন প্রদেশের কয়েকজন সামরিক কমান্ডার সেখানকার মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকা সফর করেছেন, আঞ্চলিক রাজধানী সিত্তেয় অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে হাজির হয়েছেন।

বাংলাদেশের সংবাদ সংস্থা ইউএনবি ৫ ফেব্রুয়ারির এক সংবাদে জানায়, কমান্ডাররা স্থানীয় রোহিঙ্গা মুরব্বিদের সঙ্গে দেখা করেন এবং সেখানকার মসজিদ সংস্কারে ৩৫০ ডলার ও খাদ্য দান করেন। রাখাইনের অন্য প্রধান শহর মংডোতেও সামরিক কর্তাদের সফরের সংবাদ এসেছে। এসব কমান্ডার বলার চেষ্টা করছেন যে সেনাবাহিনী নয়, সু চিই রোহিঙ্গাদের বিতাড়ন করেছেন। এই খবরও এসেছে যে অনেক রোহিঙ্গাই সু চির পতনের খবর শুনে উল্লসিত হয়েছেন। কিন্তু অভিজ্ঞরা ভালো করেই জানেন যে রাখাইনে রোহিঙ্গা বিদ্বেষে সেনাবাহিনী ও সু চির রাজনৈতিক দল এনএলডি দুজন দুজনার। সরকারপ্রধান হিসেবে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ করা হয়েছে, তার দায় সু চি এড়াতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে রাখাইনে গণহত্যা ও পোড়ামাটি নীতির কারিগর দেশটির সেনাবাহিনী। স্বরাষ্ট্র ও সামরিক উভয় মন্ত্রণালয়ই তাদের হাতে।

তাহলে কেন তারা সু চির ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের রোহিঙ্গাদের বন্ধু প্রমাণ করতে চাইছে? কেন বাংলাদেশের কাছে চিঠি পাঠিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগী হবে বলে ভরসা দিচ্ছে? তাদের এই কৌশলে রোহিঙ্গাদের ভোলার কথা নয়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর এই মুখোশের প্রদর্শনী মিয়ানমারের বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশেও নয়। রাখাইনে তাদের সেনাবাহিনীর আগ্রাসী ভূমিকার সবচেয়ে বড় সাক্ষী তো তাদের দেশেরই মানুষ। বাংলাদেশিদেরও ভূতের মুখে রামনাম শুনে বিভ্রান্ত হওয়ার কথা নয়।
তবে বিভ্রান্ত হওয়ার অন্য মানুষও আছে।

বাংলাদেশ দূতাবাসে চিঠি পাঠানোতেই তারা থামেনি, রাখাইনে শরণার্থীশিবিরে সামরিক কর্তারা আশার বাণী শোনাতেও গেছেন। তার চেয়ে বড় যা তা হলো মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন হ্লাইংয়ের ভাষণ। সেখানে তিনি ‘বাংলাদেশে অভিবাসী’ হওয়াদের ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন। বাংলাদেশ গত বছর মিয়ানমারের কাছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ৮ লাখ ৮৪ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর তালিকা দিয়েছিল। মিয়ানমার জবাবে যাচাই করেছে মাত্র ৪২ হাজার জনকে। কিন্তু এসবের নামে মিয়ানমার যথেষ্ট সময়ক্ষেপণের মওকা বানিয়ে নিয়েছিল।