বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন নতুন আক্রান্তদের খোঁজ মিলছে। এই আক্রান্তদের সংখ্যার সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত: আমাদের টেস্ট করার সক্ষমতা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবস্থান।
আমরা যত বেশি টেস্ট করতে পারব, তত বেশি আক্রান্তদের পৃথক করা যাবে, যা কমিউনিটি ট্রান্সমিশন রোধে একটি কার্যকরী পদ্ধতি হিসেবে বিশ্ব স্বীকৃত। এর সঙ্গে যদি কার্যকরীভাবে কন্ট্রাক্ট ট্রেসিং করা যায়, তাহলে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন অনেকটাই লাগাম দেওয়া যাবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে লকডাউন বা সাধারণ ছুটি ২৬ মার্চ থেকে কার্যকরী করার সুফল পাওয়া গেছে, উপাত্ত বিশ্লেষণ করেও আমরা দেখতে পারছি। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের সংক্রমণের গতি এখনো মাত্রা ছাড়িয়ে যায়নি।
এবার আসি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। আমরা কি ধারণা করতে পারি, আক্রান্ত ব্যক্তিদের অবস্থান কোথায় বেশি হবে বা হতে পারে? সাধারণ ছুটি ঘোষণার আগেই অনেকে সংক্রমিত হয়েছেন এবং এই সংখ্যা পুরোপুরি বুঝতে কমপক্ষে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এই সংক্রমিত ব্যক্তিদের অবস্থান বা ক্লাস্টার যদি আমরা আগে থেকেই নির্ণয় করতে পারি, তাহলে ঝুঁকি ও সংক্রমণ মোকাবিলায় পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। সে ক্ষেত্রে টেস্ট কিটের স্বল্পতা থাকলেও পূর্বপ্রস্তুতি অনেক মূল্যবান প্রাণহানি থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে।
কিন্তু কীভাবে এই অবস্থান আগে থেকেই বের করা যায় বা যেতে পারে?
উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই বিশ্বমানের পদ্ধতি, যেমন মোবাইল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংক্রমণের হটস্পট বা একসঙ্গে বহু ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন, এমন জায়গাগুলো নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমাদের দেশেও হয়তো এই পদ্ধতি ব্যবহার করে হটস্পট বের করা সম্ভব, কিন্তু কত দ্রুত আর কার্যকরীভাবে এই বিশ্লেষণ করা যাবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
আমাদের হাতে যেহেতু অভিবাসীদের বাংলাদেশের প্রবেশের সঠিক তথ্য নেই, সেহেতু আমাদের আয়ত্তে থাকা অন্য বিকল্প তথ্য–উপাত্ত দিয়েই কাজ শুরু করে দিতে পারি। বাংলাদেশের বেশ কিছু অঞ্চলে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের হার বেশি। করোনাভাইরাস যেহেতু আন্তর্জাতিক পথে আমাদের দেশে সংক্রমিত হয়েছে, সেহেতু দেশের যে অঞ্চলগুলোয় আন্তর্জাতিক অভিবাসীদের বাড়ির সংখ্যা বেশি, সে অঞ্চলগুলো অন্যান্য অঞ্চলের থেকে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। একইভাবে যে অঞ্চলে বেশির ভাগ পরিবারে অভ্যন্তরীণ অভিবাসী বেশি আছে, সে অঞ্চলগুলোও ঝুঁকিতে আছে। এর সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক জনসংখ্যার ঘনত্ব এখানে রোগ সংক্রমণের একটা নিয়ামক হতে পারে। এই সব সূচক বিবেচেনায় নিয়ে আমরা সংক্রমণ ইনডেক্সে বা ঝুঁকিভিত্তিক অঞ্চলের তালিকা করতে পারি। যদি আমাদের এই ধারণা সঠিক হয়, তাহলে করোনা সংক্রমণের হার এই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোয় তুলনামূলকভাবে বেশি হবে। আমাদের প্রস্তুতিও নিতে হবে আগে থেকেই।
আমরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান অধিদপ্তরের খানা আয় এবং ব্যয় জরিপ (২০১৬) ব্যবহার করে একটা প্রাথমিক বিশ্লেষণ এখানে আলোচনা করছি। এ জরিপটি পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে থাকা ৪৬ হাজার পরিবারের তথ্য নিয়ে করা হয়েছে।
প্রথমে জরিপ ব্যবহার করে আমরা প্রতিটি জেলা থেকে কত সংখ্যক অভিবাসী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন, তা খুঁজে নিয়েছি। এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি জেলার আলাদা ভর সূচক তৈরি করেছি। এই ভর সূচকটি সেই জেলাগুলোর জন্য বেশি মান নেবে, যে জেলার অভিবাসীরা কোভিড-১৯–এর হার বেশি দেশের অভিবাসী (যেমন: ইতালির অভিবাসী হলে বেশি মান কিন্তু মরিশাসের অভিবাসী হলে কম মান)।
বর্তমানে ঢাকায় যেহেতু সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি, তাই আমরা পরবর্তী ধাপে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনকে অন্তর্ভুক্ত করেছি। নতুন ভর সূচক দিচ্ছি সেসব জেলাকে যেখান থেকে ঢাকাতে অভিবাসনের হার বেশি। সর্বশেষে, কোভিড-১৯ ভাইরাসটি যেহেতু ঘনবসতি এলাকায় ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি, তাই আমরা প্রতিটি জেলার জনসংখ্যা ঘনত্বকে আরেকটা নতুন ভর সূচকে নিয়ে নিচ্ছি। এই তিন ভর সূচকের সম্মিলনে তৈরি করি একটি জেলাভিত্তিক সংক্রমণ ইনডেক্সে। এই ইনডেক্সের মান যত বেশি হবে, সেই জেলাগুলো আমাদের হিসাব অনুযায়ী বেশি ঝুঁকিতে আছে।
এবার দেখি আমাদের এই সংক্রমণ ঝুঁকি ইনডেক্স, কোভিড-১৯–এর জেলাভিত্তিক তথ্যের সঙ্গে কতটা সাদৃশ্যপূর্ণ?
এই ক্ষেত্রে প্রথমে ম্যাপ–ভিত্তিক একটি বিশ্লেষণ করে নিই। ওপরের বাঁ পাশের ম্যাপটি সংক্রমণ ঝুঁকি ইনডেক্স ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। সংক্রমণের আপেক্ষিক সম্ভাবনা অনুযায়ী জেলাগুলকে সাদা থেকে লাল রং দেওয়া হয়েছে (যত বেশি লাল তত ঝুঁকিপূর্ণ)। ডান পাশের ম্যাপটি আইইডিসিআরের ১৯ এপ্রিলের কোভিড-১৯–এর জেলাভিত্তিক তথ্য দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এখানে দুটি ম্যাপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
এবার একটু গাণিতিক মাপজোখে যাই। এখানে ম্যাপ দুটির মধ্যে সম্পর্ক বোঝার জন্য নিম্নোক্ত গ্রাফটি সাহায্য করবে। গ্রাফটির অনুভূমিক বা সমতল অক্ষে, আমরা ওপরে উল্লেখিত তৈরি করা সংক্রমণ ঝুঁকি ইনডেক্স রাখা হয়েছে। এই সূচকের মান এক থেকে সর্বোচ্চ চার হতে পারে। সূচক অনুযায়ী যেই জেলার সূচকের মান যত বেশি, সেখানে কোভিড-১৯ সংক্রমণের সম্ভাবনা তত বেশি। যেহেতু আমরা ঢাকা থেকে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন নির্ণয় করেছি, সেহেতু ওই গ্রাফটিতে ঢাকাকে ব্যবহার করা হয়নি। গ্রাফটির উল্লম্ব বা লম্বালম্বি অক্ষে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত জেলাভিত্তিক কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যাকে আমরা সহজে উপস্থাপনের নিমিত্তে জ্যামিতিক সরলীকরণের মাধ্যমে ০ থেকে ২–এর মধ্যে রেখেছি এবং যেসব জেলায় এখনো কোভিড-১৯ রোগী পাওয়া যায়নি, তাদের মান শূন্যের নিচে অর্থাৎ নেগেটিভ রেখেছি।
ওপরের গ্রাফটিতে জেলাভিত্তিক সংক্রমণের সূচকের সঙ্গে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যার একটি শক্তিশালী পারস্পরিক সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। এই সম্পর্কের পরিমাপ গাণিতিকভাবে শূন্য দশমিক ৪০। একটু বুঝিয়ে বলি। নিম্নোক্ত গ্রাফ অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁওয়ের সংক্রামক সূচক পয়েন্ট ১ দশমিক ৫২৩২ এবং ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত কোভিড-১৯ ভাইরাসে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ছয়। অন্যদিকে, মুন্সিগঞ্জের সংক্রামক সূচক পয়েন্ট ৩ দশমিক ৬০০৫ এবং ওই তারিখ পর্যন্ত সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ৩৩। এই গ্রাফ থেকে আমরা অনুমান করতে পারি কোন কোন অঞ্চলে কোভিড-১৯–এর আক্রান্তদের সংখ্যা খুব তাড়াতাড়ি বেড়ে যেতে পারে। আমাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বৃহত্তর ঢাকা জেলা (ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ইত্যাদি) ছাড়াও শরীয়তপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও ময়মনসিংহ আরও বেশ কিছু জেলা করোনাভাইরাসের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে আমাদের এই অতিসাধারণ বিশ্লেষণে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যেমন বিশ্লেষণে অভিবাসন আর জনসংখ্যার ঘনত্বকে করোনাভাইরাস বিস্তারের মূল উপাত্ত ধরা হয়েছে। তবে করোনাভাইরাস অন্যভাবেও ছড়াতে পারে (যেমন পরিবহনব্যবস্থা, পর্যটন, লকডাউনের অকার্যকারিতা ইত্যাদি) যা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া আমাদের বিশ্লেষণ জেলা পর্যায়ে করা হয়েছে, কিন্তু আরও ভালো হতো যদি আমরা এই বিশ্লেষণ উপজেলা, থানা কিংবা ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত করতে পারতাম, কিন্তু তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা তা করতে পারিনি।
বর্তমান যেকোনো ধরনের সামাজিক গবেষণা, যা নীতিকৌশলকে সাহায্য করতে পারে, তা ভালোভাবে সম্পাদন করতে গেলে সঠিক এবং পূর্ণাঙ্গ তথ্যের প্রয়োজন হয়। আমারা যদি কোনোভাবে বর্তমানে বাংলাদেশ ফেরত আভিবাসীদের অবস্থানের সঠিক তথ্য নির্ধারণ করতে পারতাম এবং ঢাকা থেকে যারা নিজ নিজ জেলায় ফেরত গিয়েছে, সেটি জানতে পারতাম, তাহলে আরও সূচারুভাবে সংক্রমণের আশঙ্কা নির্ণয় করা সম্ভব হতো। এ ক্ষেত্রে বিকল্প তথ্যের উৎস হিসেবে মোবাইল ফোনের টাওয়ার ডেটা কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের রেমিট্যান্স ডেটা আমাদের গভীর বিশ্লেষণে বিশেষভাবে সহায়তা করতে পারে।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে কোভিড-১৯ হয়তো আমাদের জীবদ্দশায় শেষ আন্তর্জাতিক পরাক্রমী ভাইরাস না–ও হতে পারে। যেকোনো ধরনের আন্তর্জাতিক সংক্রামক স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের তৈরি থাকতে হবে সব ধরনের তথ্য–উপাত্ত নিয়ে, যাতে আমরা খুব সহজে এই ধরনের ভাইরাসের ভবিষ্যতে মোকাবিলা করতে পারি; স্বাস্থ্যগত, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দিক দিয়ে।
শেষ কথায় আসি। এই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোয় এখনই যদি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে টেস্ট করার সক্ষমতা বাড়ানো যায়, তাহলে খুব ভালো হয়। এর পাশাপাশি যদি হাসপাতাল এবং স্থানীয় প্রশাসনকে করোনাভাইরাস মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবহারযোগ্য সম্পদ (যেমন হাসপাতাল শয্যা, সুরক্ষার সরঞ্জাম ইত্যাদি) দেওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হবে। একই সঙ্গে এই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ লকডাউন এবং সর্বোচ্চ সতর্কতা নিশ্চিত করাটাও জরুরি। সীমিত সম্পদের ক্ষেত্রে এই ধরনের বিশ্লেষণ ‘কোথায় এক্ষুনি কাজে নামতে হবে’, এই ধরনের আগ্রাধিকার নির্বাচনের বিষয়টি ঠিক করে দেয়। সে ক্ষেত্রে দেশে ও বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞরা দেশের এই সংকটকালীন সরকারের সহযোগিতায় আসতে পারেন। আশা করি কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করে দেখবেন।







