চিরদিন কারও এক রকম যায় না। যে জাহাজটিকে বলা হচ্ছিল কখনোই ডুববে না, সবাইকে হতবাক করে সেই টাইটানিকও ডুবেছে। একসময় যে ইয়াহু ছিল ইন্টারনেটের সমর্থক তিন দশকের কম সময়ে, সেই ইয়াহু হারিয়ে যেতে বসেছে। যে নকিয়া ছিল মোবাইল ফোন দুনিয়ার শীর্ষে, তারা এখন প্রত্যাবর্তনের পালা অতিক্রম করছে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, কী হবে ফেসবুকের? ফেসবুকও কি সময়ের তালে হারিয়ে যাবে? ফেসবুকের ভবিষ্যৎ কি তবে ইয়াহুর মতো হতে চলেছে?
ইকোনমিস্ট তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ইকোনমিস্ট বলছে, ফেসবুক কর্তৃপক্ষের এখন ইন্টারনেটের ইতিহাসে চোখ বোলানোর সময় চলে এসেছে। ফেসবুকের ব্যবহার কমে যাচ্ছে। বিজ্ঞাপনদাতারা সরে যাচ্ছে। ফেসবুকের ব্যবসার মডেল বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। ফেসবুক ঘিরে ব্যবহারকারীদের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। তবে কি ফেসবুকের পতন আসন্ন? ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গকে এখন পর্যন্ত ‘চতুর’ আর ‘দূরদৃষ্টিসম্পন্ন’ বলা যায়। এখন পর্যন্ত সব চাপ সামলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অর্থ-ক্ষমতায় বশে রেখে তরতর করে এগিয়ে চলেছেন। কিন্তু ফেসবুকের এই এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে এখন বড় প্রতিবন্ধকতা আসতে শুরু করেছে। নির্বাচনে হস্তক্ষেপ, ভুয়া খবর ছড়ানো, ব্যবহারকারীর তথ্য নিরাপত্তার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। জাকারবার্গকে সরানোর প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। এ চাপ সামলাতে পারবেন তো জাকারবার্গ?
ফেসবুক–আসক্তিতে যা হচ্ছে ও হতে পারে
ইকোনমিস্ট বলছে, ফেসবুককে এখন বলা হচ্ছে বড় নেশা। তুলনা করা হচ্ছে সিগারেট ও তামাকের সঙ্গে। সিগারেটের নেশার চেয়েও মারাত্মক ফেসবুকের আসক্তি। একবার এ আসক্তি পেয়ে বসলে সর্বনাশ। সোনার দেহ মাটি হবে। একাকিত্ব বাসা বাঁধবে মনে। বাড়বে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কোনো কিছু চোখের আড়াল হওয়ার ভয় কাজ করবে। অন্যের সাফল্যে হিংসা হবে। ঈর্ষা জাগবে। তৈরি হবে আত্মহত্যার প্রবণতা। প্রযুক্তি দুনিয়ার বড় বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা জনসমক্ষেই ফেসবুকের নেতিবাচক প্রভাবের কথা বলছেন। এর আসক্তি কাটাতে পরামর্শ দিচ্ছেন। ফেসবুকের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ক্লাউড কম্পিউটিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সেলসফোর্সের প্রধান নির্বাহী মার্ক বেনিওফ যেমনটা বলেছেন, ‘ফেসবুক হলো নতুন সিগারেট। আপনারা জানেন, এটা আসক্তি সৃষ্টি করে। এটা আপনার জন্য ভালো নয়। আপনাকে অনেক মানুষ এটা ব্যবহার করার জন্য টেনে আনবে। কী ঘটবে, আপনি বুঝতেই পারবেন না। তাই সরকারের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কী ঘটছে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি।’ শিশুদের ওপর ফেসবুকের প্রভাব নিয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেন বেনিওফ। তাঁর ভাষ্য, সিগারেট যেভাবে সমাজের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে, ফেসবুকও সেভাবেই প্রভাব ফেলছে। কয়েকটি গবেষণায় এ বিষয়টি উঠে এসেছে।
গত বছর থেকেই ফেসবুকের বিরুদ্ধে বেশি অভিযোগ আসা শুরু করে। সমস্যা ঠিক না করে ফেসবুকের সমালোচকদের ঠেকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কর্তৃপক্ষ। সমালোচকেরা ফেসবুককে আসক্তিকর, গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বলে একে নিয়ন্ত্রণের কথা বলতে শুরু করেন। তবে ফেসবুকের সঙ্গে মাদক বা সিগারেটের তুলনার চেয়েও কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ফেসবুককে। অনেকেই বলছেন, ফেসবুক এখন পতনের প্রান্তে। ইয়াহুর পরিণতি হবে ফেসবুকের। ইন্টারনেট দুনিয়ার রাজা পড়ে থাকবে আস্তাকুঁড়ে।
ইন্টারনেট দুনিয়ার একসময় রাজা ছিল ইয়াহু। ইন্টারনেটের শুরুর প্রথম দিকে ওয়েবসাইট ডিরেক্টরি হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল ইয়াহুর। গত শতকের শেষের দিকে ইন্টারনেটের সমার্থক ছিল ইয়াহু। ডটকম যুগের সূচনার দিকে এর বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছিল। কিন্তু ইয়াহুকে অধিকাংশ সময় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বদল, মিডিয়া, নাকি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, এ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে হয়েছে। এ ছাড়া ইন্টারনেট জগতের এখনকার বড় প্রতিষ্ঠান ফেসবুককে কেনার সুযোগ হেলায় হারিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ভেরাইজনের কাছে বিক্রি হয়ে যায় ইয়াহু।
আজ যে দুর্দশায় পড়েছে ফেসবুক, বছর খানেক আগেও ফেসবুকের এমন দুর্গতির কথা কেউ ভাবতেই পারেনি। সামাজিক যোগাযোগের সাইট হিসেবে ফেসবুক ও এর অধীনে থাকা ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকের মেসেঞ্জারের ব্যবহার বাড়ছিল। কিন্তু এ বছরের জানুয়ারি মাস থেকে হঠাৎ চিত্র বদলাতে শুরু করল। ফেসবুক ঘিরে তৈরি কিছু বিতর্ক, ভুল বোঝাবুঝি আর কিছু ভুল পদক্ষেপে ফেসবুক নিয়ে নেতিবাচক খবরের ঢেউ উঠল। সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল, ফেসবুক ব্যবসা বাদে অন্য কিছু ভাবেনি।




