প্রায় ৬০০ আন্দোলনকারীকে হত্যা করেছে মিয়ানমার সরকার

তুরস্ক থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত অন্তত ২৫টি দেশে সিরিয়ার শরণার্থী আছে এখন। লাখের ওপরে আছে অন্তত ৮ দেশে। তুরস্ক একাই সামলাচ্ছে ৩৫ লাখ। ঠিক এ কারণেই মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের শঙ্কা যত বাড়ছে, আশপাশের দেশে ভয় বাড়ছে তত।
বাংলাদেশসহ ৫টি দেশের সীমান্ত আছে মিয়ানমারের সঙ্গে। এ রকম সব দেশে এখনই মিয়ানমারের কিছু না কিছু শরণার্থী আছে। গৃহযুদ্ধ শুরু হলে পুরোনোদের সঙ্গে নতুন করে কত গুণ শরণার্থী যুক্ত হবে, সেটা অনুমান সহজ নয়। কারণ মিয়ানমারের পরিস্থিতি হতে পারে সিরিয়ার চেয়েও ভয়াবহ। এখানে বহু গেরিলা গ্রুপের হাতে অনেক আগে থেকেই বিপুল অস্ত্র আছে। সঙ্গে রয়েছে যুদ্ধের রসদ হিসেবে ঐতিহাসিক জাতিগত রেষারেষি। আবার, দেশটির সশস্ত্র বাহিনীরও খুনোখুনিতে কুখ্যাতি রয়েছে।

গৃহযুদ্ধের শঙ্কার কথা জানিয়ে রেখেছে জাতিসংঘ

মিয়ানমারে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ইতিমধ্যে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের শঙ্কা জানিয়ে রেখেছেন বিশ্বকে। তাঁর অনুরোধ, নিরাপত্তা পরিষদ দ্রুত পদক্ষেপ নিক। দেরি করলে গৃহযুদ্ধ অনিবার্য। জাতিসংঘের দূত ক্রিস্টিন শানার বার্গেনারের এই শঙ্কা অমূলক নয়। ইতিমধ্যে প্রায় ৬০০ আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের ৪০-৫০ জনই কিশোর-কিশোরী। এই আন্দোলন তার অস্তিত্বের কারণেই বর্তমান অহিংস চরিত্র থেকে ক্রমে সশস্ত্র প্রতিরোধের দিকে যেতে পারে। সামরিক বাহিনীরও তাতে সুবিধা। সে রকম হলে তাদের নির্বিচারে গুলি চালানো সহজ হয়। ক্রিস্টিন গৃহযুদ্ধের শঙ্কার পাশাপাশি জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদকে এ-ও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, আসন্ন এই যুদ্ধ হবে ‘এশিয়ার কেন্দ্রে বহুমাত্রিক এক বিপর্যয়’। মিজোরাম ও থাইল্যান্ডের চিয়াং রাই সীমান্তে সেই বিপর্যয়ের কিছু আলামত দেখা যাচ্ছে ইতিমধ্যে।

পুরোনো সশস্ত্র আন্দোলন নতুন করে চাঙা হচ্ছে

‘তাতমাদো’ নামে পরিচিত মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী যেভাবে ক্যুর বিরোধিতা মোকাবিলা করছে, তাতে লাখ লাখ মানুষের সীমান্ত না পেরিয়ে উপায় নেই। শুরুতে সশস্ত্র বাহিনীর তৎপরতা রাস্তাঘাটের ধরপাকড়ে সীমিত থাকলেও এখন বিমানবাহিনীও ব্যবহৃত হচ্ছে তাদের সমর্থনে। কারেন, কাচিনসহ বিভিন্ন এলাকায় তাতমাদৌর সঙ্গে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনপন্থীদের যুদ্ধবিরতির মতো পুরোনো অবস্থা ভেঙে পড়েছে এরই মধ্যে। ক্যুর পর থাইল্যান্ড-সংলগ্ন কারেন এলাকায় ২০ বছর পর তাতমাদৌ আবার বোমা ফেলল।

কাচিন আর্মি, টাঙ লিবারেশন আর্মি এবং আরাকান আর্মি মিলে ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ নামে একটা জোট করে ইতিমধ্যে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানিয়েছে। শান স্টেটের ‘রেস্টোরেশন কাউন্সিল অব শান’ও ক্যুর বিরুদ্ধে।

সংখ্যালঘু গেরিলারা পরিস্থিতির সুযোগ নিতে তৎপর

মিয়ানমারে অ-বামার প্রায় সব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র সংগঠন আছে। এ রকম সংগঠন প্রায় ২০টি হবে। তার অন্তত চারটি (ওয়া আর্মি, কারেন ইউনিয়ন, আরাকান আর্মি ও কাচিন আর্মি) দেশের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে।
এদের কারও এলাকাতে মানুষ ক্যুর পক্ষে নয়। ওয়াদের এলাকায় প্রতিবাদ বিক্ষোভ কম। কারণ, ওয়া আর্মি গণচীন প্রভাবিত। এটাই মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় গেরিলা দল। অন্য সব জায়গায় আন্দোলনকারীরা সক্রিয়। গণতন্ত্রপন্থীদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর নিপীড়নে কোনো এলাকাতে স্থানীয় গেরিলাদের উদাসীন থাকার সুযোগ কম। আবার তাতমাদৌকে সহযোগিতা করাও অসম্ভব। তাতে স্থানীয় সমাজের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি নিতে হবে গেরিলাদের। সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিও (এনএলডি) এটাকে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে নেবে।

কারেন ও কাচিনরা অভ্যুত্থানবিরোধী জনমতের সুযোগে ইতিমধ্যে আর্মির কিছু চৌকি দখল করে নিয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, জাতিগত সংখ্যালঘুরা এনএলডি আর তাতমাদৌর বিরোধের সুযোগ নিতে তৎপর। এনএলডি ও তাতমাদো উভয়ে বামার জাতি প্রভাবিত। সে কারণে অন্যান্য জাতিসত্তার ছোট ছোট সশস্ত্র গ্রুপগুলো বর্তমান অবস্থাকে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ের ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে নিতে চাইছে। এনএলডি ও তাতমাদো উভয়ের সঙ্গে তাদের দর-কষাকষির সুযোগ আছে।

যেহেতু সাধারণভাবে তরুণ-তরুণীরা ক্যুর বিপক্ষে, সে কারণে সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই গেরিলা দলগুলোর জন্য নৈতিক দিক থেকে সহজ। এ রকম অবস্থা গৃহযুদ্ধে জ্বালানি জোগানোর মতো হতে পারে। তবে তাতমাদৌ স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে বড় আকারে ছাড় দিলে এসব গেরিলা গ্রুপের অনেকে তাদের পক্ষেও যেতে পারে। সে ক্ষেত্রেও দেশটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও তাতমাদৌর কর্তৃত্ব এখনকার মতো আর থাকবে না।

কারেন ও কাচিনদের মতো আরাকান আর্মিও যদি তাতমাদৌর বিরুদ্ধে অপারেশন বাড়িয়ে দেয়, তাহলে মিয়ানমারের প্রতিবেশীদের বাড়তি শরণার্থী গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে হয়তো। ওয়া আর্মির বাইরে ওই তিনটিই হলো মিয়ানমারের শক্তিশালী গেরিলা দল। আরকান আর্মিকে তাতমাদৌ ক্যুর পর ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠনের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিল আপসমূলক উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু আরাকান আর্মির অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থান জানিয়ে দিচ্ছে গেরিলা দলগুলোর পক্ষে এ মুহূর্তে তাতমাদৌর সঙ্গে আপসে কিছু করা কঠিন। অহিংস গণ-আন্দোলনকে তারা অগ্রাহ্য করতে পারছে না।

বামার তরুণ-তরুণীদের সশস্ত্র ঝোঁক বাড়ছে

এ মুহূর্তে মিয়ানমারের পরিস্থিতি থেকে উঠে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আন্দোলনকারীরা কত দিন অহিংস থাকবে? বামার তরুণ-তরুণীদের একাংশ মনে করছে, অহিংস বিক্ষোভে কেবল শক্তি ক্ষয় হচ্ছে। তাতমাদৌকে এভাবে কোণঠাসা করা কঠিন। তবে এদের সশস্ত্র হওয়া ‘বিদেশি সহায়তা’ ছাড়া সম্ভব নয়। আপাতত দেশি বন্দুক ও স্থানীয়ভাবে তৈরি বোমা দিয়ে কিছু সশস্ত্র কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে, যা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় ভবিষ্যৎ কোন দিকে যেতে পারে। বামারদের মধ্যে সহিংস প্রতিরোধের বিষয়ে যত আগ্রহ তৈরি হবে, ততই দেশজুড়ে নৈরাজ্য বাড়তে বাধ্য। সশস্ত্র বাহিনীকে তখন সংখ্যালঘু জাতিগুলোর সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মূল জনগোষ্ঠী বামারদেরও সশস্ত্রভাবে মোকাবিলা করতে হবে।