কিশোর ও তরুণ বয়স জীবন গঠনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়

একজন শিশুর বিকশিত হওয়া কৈশোরকাল থেকে শুরু হয়। কিশোর ও তরুণ বয়স জীবন গঠনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়। শিশু-কিশোরদের এ সময়ে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন ঘটে। এ সময়ে তীব্র আবেগ কাজ করে, সবকিছু জানা ও শেখার আগ্রহ বাড়ে, ঠিক-ভুল বাছাই করার মানসিকতা থাকে না, নিজের মতো করে ভাবতে শুরু করে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার যোগ্য মনে করে। একজন শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশে এ সময়টা বড্ড নাজুক, তাই তারা সহজেই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়। বাবা-মায়ের অতিরিক্ত শাসন বা ব্যস্ততা, পারিবারিকভাবে তেমন সঙ্গ না পাওয়া ইত্যাদি কারণে বন্ধুরাই সবচেয়ে আপন হয়ে ওঠে। একজন কিশোর যখন কোনো খারাপ বন্ধুদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন সে ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যায়। কৌতূহলবশত কিংবা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে প্রথমে ধূমপান থেকে শুরু করে ক্রমেই বিভিন্ন মাদকদ্রব্য সেবনে আসক্ত হয়ে পড়ে। মাদকাসক্তির এই পথ ধরে জন্ম নেয় কিশোর গ্যাং, চুরি, ছিনতাই-চাঁদাবাজি এবং নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। খারাপ সঙ্গ শুধু কিশোর-তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটায় না; বরং তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে। পড়ালেখায় অমনোযোগিতা এবং পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরির ফলে তাদের জীবন এক চরম হতাশায় পর্যবসিত হয়। তাছাড়া বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ফোনের ব্যবহার, দলবেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে রাতজাগা, গেমের ভেতর অশ্লীল গালাগাল ও উদ্ধত পূর্ণ আচরণ, টিকটিক করে ভাইরাল হওয়ার নেশা কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। এসব সামাজিক সাইট ও অনলাইন গেমের আইটেম কিনতে গিয়ে মা-বাবার অগোচরে টাকা খরচ করছে। টিকটক বা রিলসে লাইক, ভিউ ও কমেন্টই হয়ে ওঠে আত্মমূল্যের মাপকাঠি। জনপ্রিয়তার লোভে অনেকে বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ নেয়, অনুপযুক্ত কনটেন্ট বানায়, যার ঝুঁকি প্রাণহানি পর্যন্ত গড়াতে পারে। ট্রল ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে বাড়ে হীনম্মন্যতা ও মানসিক চাপ। প্রতিনিয়ত রাত জাগার ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে এবং চোখের সমস্যা ও মাথাব্যথা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে খিটখিটে মেজাজ, একাকিত্ব ও উদ্বেগ বাড়ে। অথচ ব্যস্ততার কারণে অনেক বাবা-মা জানেনই না তাদের সন্তান কার সঙ্গে মিশছে বা মোবাইলে কী দেখছে কিংবা কতটা হতাশায় ভুগছে। বাবা-মা টের পেতে পেতে সন্তানরা অনেকটাই জড়িয়ে পড়ে। তখন তাদের ফিরিয়ে আনা অনেকটাই কষ্টসাধ্য। এর প্রভাব শুধু কিশোরের ওপর পড়ে না, পরিবার এবং সামাজিক জীবনে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে। এসবে আসক্ত কিশোর পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে ওঠে, ফলে অনেকের শিক্ষাজীবন মাঝপথেই থেমে যায়। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে, আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যায়। তাদের এসব কাজে বাবা-মা লজ্জিত ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, পরিবারে নেমে আসে অশান্তি ও অর্থকষ্ট। দেশ একজন সম্ভাবনাময় জনসম্পদ হারায়। শিশু-কিশোরদের সুন্দরভাবে বিকশিত হওয়ার পথে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া সবচেয়ে জরুরি।