নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মেয়র প্রার্থীরা। ২২শে ডিসেম্বরের
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৭ মেয়র প্রার্থীর ৫ জনই এ শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার দাবি তুলেছেন প্রার্থীরা সবাই। একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিয়োগের দাবিও জানিয়েছেন।
গতকাল নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তারা নির্বাচন নিয়ে ভোটার ও নিজেদের নানা আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেন। তুলে ধরেন অসঙ্গতি, অভিযোগ-অনুযোগ, দাবি-দাওয়া।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাবেদ আলী ৭ মেয়র প্রার্থী, রিটার্নিং অফিসার, জেলা প্রশাসকসহ নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে এই আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভা করেন। তিনি আড়াই ঘণ্টার মতবিনিময় সভায় নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা হবে আশ্বস্ত করেন তাদের। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়া এতে সভাপতিত্ব করেন। ৭ মেয়র প্রার্থীসহ আলোচনায় আরো অংশ নেন রিটার্নিং অফিসার (উপসচিব) মো. নুরুজ্জামান তালুকদার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার (নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন কর্মকর্তা) মো. তারিকুজ্জামানসহ ৯ সহকারী রিটার্নিং অফিসার, জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকতা, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত ২৭ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দেশের সপ্তম সিটি করপোরেশন নারায়ণগঞ্জের আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হয়েছিলেন ৮ জন। বাছাইয়ে স্বতন্ত্র প্রার্র্থী মোহাম্মদ সুলতান মাহমুদের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। এখন প্রার্থী রয়েছেন ৭ জন। এরা সবাই দলীয় প্রার্থী। গতকাল মতবিনিময় সভায় এরা সবাই উপস্থিত ছিলেন। মেয়র প্রার্থীদের মতবিনিময় পর্বে তারা সবাই বক্তব্য রাখেন। এতে সরকারদলীয় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) কামাল প্রধান সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি তুললেও নির্বাচন নিয়ে কোনো আশঙ্কা প্রকাশ করেননি। তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী মো. সাখাওয়াত হোসেন খান, বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি প্রার্থী অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা মো. মাছুম বিল্লাহ, ইসলামী ঐক্যজোট প্রার্থী মুফতি এজহারুল হক এবং বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রার্থী মো. রাশেদ ফেরদৌস নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে কিনা সেই শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
আওয়ামী লীগ প্রার্থী আইভী বলেন, গত নির্বাচনে অবস্থা আরো খারাপ ছিল। সুষ্ঠু নির্বাচন আমাদের সবার দাবি। জাতীয় নির্বাচনের মতো একে অপরকে দোষ না দিয়ে কীভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু করা যায় তা ভাবুন। সরকারি দল হিসেবে আমি কোনো বাড়তি সুবিধা এখন পর্যন্ত নেইনি, নেবোও না। গত নির্বাচনও সুষ্ঠু হয়নি বলে বিএনপি অভিযোগ করেছিল। অথচ তখন কাউন্সিলর পদে অনেক বিএনপি প্রার্থীও জিতেছিলেন। নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়ে বলা হচ্ছে। আমি গণসংযোগ করলে কিছু লোক তো রাস্তায় এসে পড়েই। এতে আমার করার কী আছে। আচরণবিধি যদি আমার ভাইও ভঙ্গ করে তাহলে তাকেও গ্রেপ্তার করা হোক। উদ্ধার করা হোক অবৈধ অস্ত্রও।
এলডিপি প্রার্থী কামাল প্রধান বলেন, ইতিমধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিয়োগ করার কথা বলেছে। আমি মনে করে এর প্রয়োজন নেই। পুলিশই তা পারবে। পুলিশের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ এলে তার বিচার হতে পারে। আর প্রতীক বরাদ্দের আগে গত শুক্রবার চাষাড়ায় ২নং রেলগেট এলাকায় পুলিশের উপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগ প্রার্থী জনসংযোগ করেছিল। সেজন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা তাও জানতে চান তিনি।
সরকারদলীয়সহ ওই দুই প্রার্থী সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন নিয়ে কোনো আশঙ্কার কথা না জানালেও বাকিরা এবং তাদের ভোটাররা শঙ্কিত বলে জানিয়েছেন। বিএনপি প্রার্থী সাখাওয়াত বলেন, যেখানেই যাচ্ছি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে কিনা সেই শঙ্কা প্রকাশ করছেন ভোটাররা। আমাদেরও সেই শঙ্কা রয়েছে। এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। উদ্ধার হয়নি অবৈধ অস্ত্র। আইডি কার্ডহীন ৭০ হাজার নতুন ভোটারের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা হয়নি। নারায়ণগঞ্জের অতীত ইতিহাসের কারণে এখনো অস্বস্তি ও ভয়ভীতি রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে আমার বিরোধ না থাকলেও তাদের মধ্যে অনেকে রয়েছেন অতি দলবাজ। আস্থার পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নামানোর কথা বলা হলেও এখনো তাদের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি জানা যায়নি। অনেক নেতাকর্মীকে এই নির্বাচন চলাকালেও মামলায় অভিযুক্ত করা হচ্ছে। দলীয় নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, এই নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহের সঞ্চার হয়েছে। এর আগে জাতীয় নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি অংশ না নেয়ায় দেশে ও বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে মানুষের পালস বুঝতে হবে। অতীতে মানুষ ভোট দিতে না পারায় এখন ভোট দেয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অতীতে যে নির্বাচনগুলো হয়েছে মানুষ তা ভালোভাবে নেয়নি। তা অনাস্থা ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। এ নির্বাচন কমিশনের অনেক বদনামও হয়েছে। অন্তত যাওয়ার বেলায় তাদের কাছে আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। তফসিলের পর থেকে এখন পর্যন্ত আমরা কিছুটা আশ্বস্ত হলেও আশা করি ভোটার ও প্রার্থীদের শঙ্কা দূর করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেয়া হবে।
ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেন, শান্তি ও সমৃদ্ধির শহর নারায়ণগঞ্জবাসী প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে তো। ব্যালট বাক্স ঠিক থাকবে তো। নাকি হওয়া হয়ে যাবে। শর্ষের ভেতর ভূত থাকার কারণেই আজ এমনটা হয়েছে। ব্যালটবাক্স যেন কারো পায়ের কাছে না থাকে। এরই মধ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, সরকারি দলের নৌকা প্রতীককে পাস করিয়ে আনা পুলিশের দায়িত্ব। আমি এই সভায় তার নাম নিলাম না। আপনারা জানতে চাইলে যে কোনো সময় তা জানানো যাবে।
ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী মাসুম বিল্লাহ বলেন, নারায়ণগঞ্জে গত ইউপি নির্বাচনে ভোট ও ব্যালটবাক্স ছিনতাই হয়েছে। এছাড়া অতীতে অনেক খারাপ চিত্র দেখেছি। তা ভোটারদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করেছে। এটা ভাঙ্গাতে হবে। গত নির্বাচনে কেন্দ্র শূন্য ছিল কিন্তু ভোট পড়েছে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ। অনেক ভোটার জানতে চায় ভোট দিতে পারবে কিনা। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই আমাদের ভয় বাড়ছে। এই নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হোক।
ইসলামী ঐক্যজোট প্রার্থী মুফতি এজহারুল হক বলেন, সন্ত্রাস, মাদক, যানজটসহ নানা সমস্যার কারণে মানুষ আজ পেরেশান। সকালেও এক বৃদ্ধা নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে জিজ্ঞেস করেন, আমার ভোট আমি দিতে পারবো তো। নাকি অন্য কেউ দিয়ে দেবে। তাহলে আমার কষ্ট করে কেন্দ্রে গিয়ে লাভ কী।
এ কমিশনের অধীনে আগের নির্বাচনগুলোর বিষয় উল্লেখ করে কল্যাণ পার্টির প্রার্থী রাশেদ ফেরদৌস বলেন, অতীতের নির্বাচনে আমরা অনেক দুর্ঘটনা দেখেছি। এ নির্বাচন নিয়ে যেন সেই দুর্ঘটনা না ঘটে। নির্বাচনের ঘটনাটাই যেন ঠিকভাবে ঘটে। এখন ভাটারদের ভোটের দিন বাড়ি থেকে বের হলে কী হবে তা ভাবতে হচ্ছে। কেন্দ্রে কী বিপদ অপেক্ষা করছে তা ভাবতে হচ্ছে।
মেয়র প্রার্থী প্রত্যেকের বক্তব্যের পর তা নিয়ে কথা বলেন নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলী। তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তার সবই করা হবে। আমরা একটি স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দিতে চাই। নির্বাচনের দিন পর্যন্ত যা কিছু করা হবে তার সবকিছুই স্বচ্ছ ও দৃশ্যমানভাবে করা হবে।
মেয়র প্রার্থীদের বক্তব্যের আগে আলোচনায় অংশ নেন নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার নুরুজ্জামান তালুকদার। তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার ২৫ দিন পার হয়েছে। আরো ১৪ দিন বাকি আছে। ২৪০ জন প্রার্থীর মধ্যে চূড়ান্তভাবে এখন ২০১ জন প্রার্থী এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে আমাদের চেষ্টার ত্রুটি থাকবে না। ৪৫ জন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৫ হাজার সদস্য দায়িত্বে থাকবেন। আমরা এমন কোনো কাজ করবো না যাতে নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়। প্রতিটি কেন্দ্রে একটি মাত্র প্রবেশপথ থাকবে। বের হওয়ার পথও থাকবে একটি। ভোটারদের কার্ড বা টোকেন নিয়ে ঢুকতে হবে। প্রতি ভোটারকে তিনটি ব্যালট দেয়া হবে। কেন্দ্র থেকে আপনারা লিখিত ফলাফল নিয়ে বাইরে যাবেন। আর প্রচারণার ক্ষেত্রে প্লেয়িং লেভেল ফিল্ড বা সবার সমান সুযোগ রয়েছে। কেউ এর বেশি কিছু করতে গেলে শাস্তির দিকে একধাপ এগিয়ে যাবেন। প্রতিটি ওয়ার্ডে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করছেন। কেউ নির্বাচনী আচরণবিধি ভাঙছে অথচ শাস্থি পাচ্ছেন না- তা হওয়ার কথা নয়। ব্যালট পেপারে হাত দিলে কেউ অক্ষত থাকবে তা হবে না। লাঠি, বন্দুকের আঘাত বা গুলি করে তাকে ধরা হবে।
সহকারী রিটার্নিং ও নারায়ণগঞ্জ জেলা নির্বাচন অফিসার তারিকুজ্জামান বলেন, এখন সারা দেশে একটি নগরীতে নির্বাচন হচ্ছে। দেশবাসী ও মিডিয়াসহ সবার দৃষ্টি এখন নারায়ণগঞ্জের দিকে। সকলের ঐকান্তিক সহযোগিতা ছাড়া সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়।






