১৯৭২ সালের মার্চে বাংলাদেশ সব ধরনের বিদেশি সেনামুক্ত হওয়ার সময়ের একটু আগে বা পর থেকে দেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় যেন হঠাৎ করেই নাভি দেখানো অজন্তা ধাঁচের শাড়ি পরা অপূর্ব সুন্দরী তরুণীদের উপস্থিতি দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। এর পাশাপাশি এলোমেলো কাপড় পরা বা না পরা, উল্টোপাল্টা কথা বলা, গাঁজা টানা, মাঝেমধ্যে নাচা-গাওয়া বা চুপ মেরে থাকা ‘বাউল’ বা ‘ফকির’ বলে পরিচিত হয়ে পড়া যুবকদেরও প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তরুণীদের বেশি দেখা যেত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর পত্রিকাপাড়া এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠানে। তথাকথিত ‘বাউল’ বা ‘ফকির’দের দেখা যেত বেশি মাজারগুলোয়, বিশেষ করে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে ‘হাইকোর্ট মাজার’ বলে পরিচিত, ‘অলিয়ে বাংলা’ বলে খ্যাত হজরত খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (র.)-এর মাজারের প্রাঙ্গণ ও আশেপাশে। এই ‘ফকির-বাউল’দের অনেকেই ছিলেন ফকির-বাউল সাজা নকল ‘বাউল’।
নব তরুণ আমার জগৎ তখন এসব এলাকাতেই—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, আর পল্টনে পত্রিকাপাড়ায় লেখালেখির নেশায় সময় কাটাতাম। এ দু’জায়গায় যেতে পথে পড়ত বাংলা একাডেমির মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সব, আর হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ। এক জায়গা থেকে অন্যটায় যেতাম হেঁটে, পথে আর তার দু’প্রান্তের জায়গাতে ওইসব সুন্দরী তরুণী আর আসল-নকল ‘বাউল-ফকির’ দেখতাম। ওই সুন্দরী তরুণী আর এইসব নকল বাউল-ফকির সম্পর্কে তখন সাধারণ্যে প্রচলিত ছিল যে, এরা গোয়েন্দা বা বিদেশি চর এবং এদের উদ্দেশ্য ছিল নব মুক্ত বাংলার পুনর্গঠনের প্রধান সম্পদ ও বাহন তরুণদের নারী ও মাদকাসক্ত করে নষ্ট করা। তা কতদূর সত্য, খোদাই জানেন।
ওই সময়ই আজম ভাই (আজম খান) উপরোক্ত চরণগুলো লেখেন এবং তা গেয়ে জনপ্রিয় করেন। দেশমুক্তির পরপরই তরুণ ক’জন, শাহযাদ ফিরদাউসের উদ্যোগে ‘সমষ্টি’ নামে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি সংগঠন করে তার পট ধরে ‘ব্লু ড্রাগন’ নামে বাংলাদেশের প্রায় নিশ্চিত প্রথম পপ সংগীত ব্যান্ড গঠন করেন। আমি নিজে ওই ধরনের পাশ্চাত্যানুকরণ-মূলক সংগীত ব্যান্ড খুব একটা পছন্দ না করলেও তাতে থাকি প্রধানত সংগীত দলটিতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাহযাদ ফিরদাউস, জামশেদুজ্জামান, তার অগ্রজ ফখরুজ্জামান—তাদের সঙ্গে থাকার জন্য অনেকটা, আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আমার আবাল্য আগ্রহ ও সংশ্লিষ্টতার সুবাদে। দলের ফখরুজ্জামান ভাইয়ের কোনো সুবাদে পরিচিত টাঙ্গাইলের মনিরুজ্জামান ছানুর আমন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় আমরা টাঙ্গাইলে গিয়ে আমাদের প্রথম অনুষ্ঠান করতে যাই। এ অবস্থায় আমাদের দিয়ে তাদের অনুষ্ঠান করাতে আগ্রহী ছানুর স্থানীয় প্রতিপক্ষের সমর্থকরা পচা ডিম ছুড়ে অনুষ্ঠান পণ্ড করে দিলে আমাদের দল নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং তার পরপরই জিঙ্গা নামে দেশের দ্বিতীয় পপ সংগীত ব্যান্ড তৈরি হয়। তা সার্থক হয়, আর তার গীতিকার ও প্রধান গায়ক আজম খান বিখ্যাত হন। তিনি সমাজ সচেতনতামূলক গান লিখে ও গেয়ে তার বিষয়বস্তু জনপ্রিয় করেন। উপরোক্ত চরণসংবলিত গানটির মাধ্যমে ‘বাউল-ফকির’ সাজা নকলদের সম্পর্কে জনশ্রুতিটিতে বিধৃত সচেতনতা তুলে ধরেন ও জনপ্রিয় করেন। আসল-নকল ফকির বা বাউল চেনা এবং তাদের মৌলিক পার্থক্যটি ভালো করে জানা-বোঝা দরকার। না বুঝতে পারলে ১৯৭২ সালের মতোই আবার বাউলের ছদ্মবেশে বিদেশি বা বিজাতীয় চরেরা ‘বাউল’ সেজে দেশ-জাতির সর্বনাশের কাজে লেগে যেতে পারে।






