লোক নিয়োগে অনিয়মসহ অন্যান্য কারণে মালদ্বীপের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ স্থগিত করেছে

মালয়েশিয়া, মালদ্বীপসহ অন্যান্য দেশ বাংলাদেশ থেকে লোক নিয়োগ ঠেকাতে সম্প্রতি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। গত মার্চে আসা ঘোষণা অনুযায়ী, মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে আর নতুন কোনো শ্রমিক নিচ্ছে না এবং বহু অনুমোদন পাওয়া শ্রমিকেরা ৩১ মের পর আর মালয়েশিয়ায় ঢুকতে পারেননি।

অন্যদিকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ভুয়া কাগজপত্র দাখিল, লোক নিয়োগে অনিয়মসহ অন্যান্য কারণে মালদ্বীপের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ স্থগিত করেছে। এই পদক্ষেপ মালদ্বীপের অবৈধ অভিবাসন রোধ এবং পরিবর্তিত শ্রমনীতির একটি অংশ। আর মালয়েশিয়ার এই পদক্ষেপ কর্মী নিয়োগে অনিয়ম রোধ ও সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি মূলত তাদের শ্রমনীতির পুনর্মূল্যায়ন এবং ১২তম মালয়েশিয়া প্ল্যানে নির্ধারিত বিদেশি কর্মীদের জন্য সংরক্ষিত কোটা পূরণের একটি অংশমাত্র ।এ ছাড়া প্রায়ই মালয়েশিয়ার কিছু পাম তেল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগে বিরত থাকছে। অন্যদিকে বাংলাদেশি অভিবাসীরা সরকার–নির্ধারিত খরচের থেকেও মাত্রাতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকায় মালয়েশিয়ায় গিয়ে নানা বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। বলতে গেলে, মালদ্বীপের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার এ ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের জন্য একটি নতুন শঙ্কার সৃষ্টি করেছে।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশি অভিবাসীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। তারপরও বিদেশে আমরা আমাদের শ্রমবাজার ধরে রাখতে প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হচ্ছি। ফলস্বরূপ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এই অভিবাসী কর্মীরা নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। এতে বিদেশে বাংলাদেশের ‘রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি’র ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই নিজেদের আত্মসমালোচনার মাধ্যমে এই ব্যর্থতার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে আমাদের এখনই চিন্তাভাবনা করতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ব্যর্থতার কারণ

প্রথমত, বাংলাদেশের কাজের পরিবেশ বিপজ্জনক, কষ্টসাধ্য ও অস্বাস্থ্যকর—এ রকম ভ্রান্ত ধারণার কারণে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের বর্তমান ভাবমূর্তি উন্নত নয়। আমরা এখনো প্রমাণ করতে পারিনি যে আমাদের দক্ষ কর্মীদের আমরা অন্য খাতে কাজে লাগাতে পারি। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্থানীয় শ্রমবাজারের, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জন্য আমরা ভালো কর্মপরিবেশ প্রস্তুত করতে পেরেছি কি না এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের শ্রমবাজার নিয়ে কোনো ইতিবাচক প্রচার–প্রচারণা করতে পেরেছি কি না, যা আমাদের বৈশ্বিক শ্রমবাজার ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, আমাদের আইনপ্রণেতারা যেখানে প্রতিনিয়ত দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আলোচনা করছেন, সেখানে আমরা সত্যিই কি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী তৈরিতে কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে পেরেছি? বাংলাদেশের প্রায় সবারই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার আগ্রহ থাকলেও তাঁদের জন্য চাকরির সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। অথচ বিশ্বব্যাপী দক্ষ শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমরা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ফিলিপাইনের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছি। এই দেশগুলো বর্তমানে বিশ্বব্যাপী উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর কারিগর হিসেবে খ্যাত।

অন্যদিকে আমরা প্রযুক্তিগত বা কারিগরি শিক্ষা খাতকে উপেক্ষা করে চলছি। অনেক সময় আমরা পরিবারের যে সদস্যদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সক্ষমতা নেই বলে বিশ্বাস করি, তাঁদের এই কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিই। অপর দিকে দেশের স্বল্প-আয়ের পরিবারেও আজকাল অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁরা সম্মানজনক নয়—এই বিবেচনায় কোনো কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর কথা ভাবেন না। কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা এবং ভবিষ্যতে এ শিক্ষার বিনিময়ে সম্মানজনক ও উচ্চ বেতনের সম্ভাবনা আছে, সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য এখনো অনেকের কাছে অজানা।