যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইসরাইলকেই রক্ষা করে, নিরাপত্তা দেয়, আরবদের নয়

নিজ ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপন করতে দেওয়া উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর কাছে এখন এটা স্পষ্ট হওয়া উচিত যে, আমেরিকান সেনাদের উপস্থিতি তাদের রক্ষা করে না, বরং আরো বিপদে ফেলে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইসরাইলকেই রক্ষা করে, নিরাপত্তা দেয়, আরবদের নয়। ইসরাইলের যুদ্ধংদেহী নীতি এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী কৌশলেরই একটি অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরানের প্রতি আরব দেশগুলোর শত্রুতা তীব্রতর করা এবং তাদের ইরানে চলমান মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনে প্রকাশ্যে যোগ দিতে উসকানি দেওয়া। আমেরিকান ইহুদি বিলিয়নিয়াররা এক দশক ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতাকে উসকে দিয়েছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা প্রায় দেড় মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি শ্বেতাঙ্গ খ্রিষ্টান ইউরোপীয় রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা অ-খ্রিষ্টান ও অশ্বেতাঙ্গ বিশ্বের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন শুরুর আগে মার্কিন কমান্ডাররা তাদের সৈন্যদের বলেছিলেন, তাদের এই অভিযান ‘আর্মাগেডন’ বা ‘মহাযুদ্ধের’ পক্ষে একটি যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধ ‘যিশুর প্রত্যাবর্তন’ ঘটাবে।যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থি রাজনীতির মধ্যে গভীর আদর্শগত যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, তার একদিকে আছেন ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিষ্টান ও ইহুদি জায়নবাদীরা, যারা ইরান ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে আছেন ডানপন্থি খ্রিষ্টানরা, যারা বিশ্বাস করেন যে, আমেরিকাকে ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধে টেনে আনা হচ্ছে। একইভাবে প্রগতিশীল ইহুদিসহ আমেরিকার বামপন্থিদের অনেকেই মনে করেন, ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান যুদ্ধে টেনে এনেছে। নেতানিয়াহু ইসরাইলের স্বার্থেই ট্রাম্পকে ইরান আক্রমণে প্ররোচিত করেছেন।

আমেরিকার প্রধান প্রতিরক্ষা শিল্প এবং জ্বালানি সংস্থাগুলো বিশেষ করে প্যালান্টিয়ার, লকহিড মার্টিন, এক্সন, রেথিওন এবং বোয়িংয়ের মতো কোম্পানিগুলো এই যুদ্ধ থেকে সরাসরি লাভবান হচ্ছে এবং বিপুল মুনাফা অর্জন করছে। যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে বিপুল অস্ত্র দেয়, কারণ ইসরাইলের আঞ্চলিক সামরিক আধিপত্য মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করে।

আরবদের নীরবতা

ওমান ছাড়া কোনো আরব সরকারই ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা জানায়নি। ওমান এই আগ্রাসনকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে। ইয়েমেনের সশস্ত্র সংগঠন আনসার আল্লাহ (হুতি) ছাড়া কোনো আরব দেশই ইরানে ১৭০ জনের বেশি স্কুলছাত্রীর গণহত্যা কিংবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, তার পরিবার এবং সহযোগীদের হত্যার জন্য ইরানের প্রতি সমবেদনা জানায়নি।

ন্যাটোর সদস্য দেশ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইরানের কাছে সমবেদনা জানিয়েছেন। অথচ আরব সরকারগুলো এ ব্যাপারে নীরব থেকেছে। চলমান সংঘাত নিরসনে মিশরীয় ও তুর্কি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় ইরানি কর্মকর্তারা এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।

আলজেরিয়া কয়েক দশক ধরে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানে অটল ছিল। কিন্তু সম্প্রতি দেশটি গাজা উপত্যকা দখলে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগে ভোট দিয়ে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে অবস্থান নেয়। এর পরই দেশটি ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে।

কায়রোর আল-আজহারের প্রধান ইমামও ইরানের নিন্দা করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত এবং জর্ডানের (কাতার ও সৌদি আরব বাদ) প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তিনি ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের নিন্দা জানাননি। এমনকি খামেনিকে হত্যার ঘটনায়ও সমবেদনা জানাননি।

উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এবং জর্ডান দাবি করছে যে, ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু মার্কিন বাহিনী যে ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের জন্য তাদের ভূখণ্ড এবং আকাশসীমা ব্যবহার করছে সেই সত্যটি এসব দেশ উপেক্ষা করছে। ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া আরব দেশগুলো তাদের ভূখণ্ডের কিছু অংশের সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে হস্তান্তর করেছে।

আরব দেশগুলোর এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের ইরাক, সিরিয়া এবং বর্তমানে ইরানে আগ্রাসন চালানোর জন্য সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ করে দিয়েছে। এসব দেশ ‘নিরপেক্ষ’ থাকার দাবি করছে অথচ ইরানে আগ্রাসনের জন্য ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের তাদের আকাশপথ ব্যবহারের নিন্দা জানাচ্ছে না বা প্রতিরোধ করছে না।