ঘরে আগুন লাগলে মানুষ ফায়ার সার্ভিস ডাকে। কিন্তু ক্ষুধার আগুন নেভাতে আসবে কোন ফায়ার সার্ভিস? না, নেই কোনো জরুরি সহায়তা কর্মসূচি। আছে কেবল টিসিবির ট্রাক। বিশ্ব নারী দিবসে মধ্যবিত্ত জমায়েতে আর ফেসবুক মহল্লায় বেগুনি উৎসব হয়ে গেল। শ্রমজীবী নারীরা তখন ছুটছিলেন টিসিবির ট্রাকের পেছনে। একটা ছবি: ছুটন্ত ট্রাকের পেছনে ছুটেও নাগাল পাচ্ছেন না। আরেকটি ছবি: চলন্ত ট্রাকের পেছনটা ধরে ঝুলছেন এক বয়স্ক নারী। আরও মর্মান্তিক ক্রেতাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি-মারামারি। পণ্য কম, মানুষ বেশি। সন্তানদের খাওয়ানোর জন্য মরিয়া নারীদের দেখে চোখে পানি চলে আসে।
এভাবেই দরিদ্র মানুষ নিজেদের মধ্যে মারামারি করে ধনীদের রেয়াত দেয়। মজুতদারেরা হাসেন। ভুক্তভোগীরা সব জেনেও অসহায়। তাদের ক্ষমতার হাত এতই খাটো, নিজের মতো আরেকজনের গাল বা চুল শুধু ধরা যায়, মহাজনেরা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। যে দেশে রাজনীতিতে অচলাবস্থা, গরিব তো দুরস্ত, মধ্যবিত্তেরও সংগঠন নেই, সেখানে মুনাফার লাগাম ধরবে কে?
নারীরা যুদ্ধের শিকার হন বেশি। যখন মহামারি চলছিল, তখনো নারীরা অভাব আর নির্যাতনের চাপ বেশি সয়েছেন। যখন জিনিসপত্রের দাম আকাশে উঠে যাচ্ছে, তখনো বাজারের আগুন বেশি পোড়াচ্ছে তাঁদেরই। নারীদের এখন ঘরে-বাইরে কর্ম করে খাওয়া লাগে। গৃহিণী নামক গেরস্তালি শ্রমদানের পেশা দিয়ে আর পরিবার চলে না। পরিবারের সবাইকে রেঁধে খাওয়ানোর আগে বাজারটাও তাঁদেরই করা লাগে এখন। পুরুষদের লজ্জা লাগে বলে স্ত্রী-কন্যাদের তাঁরা টিসিবির ট্রাকের সারিতে পাঠান।
আসলে পুরুষেরা নন, লাখো দরিদ্র নারীকে খাদ্যপণ্যের জন্য রাস্তায় নামিয়েছে আর কেউ নয়, স্বয়ং সরকার। অর্থমন্ত্রী নীরব, বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, তাঁর কিছু করার নেই। তিনি দেখালেন আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই। চাল-তেল-আটার দাম তো বহুদিন ধরেই বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের দোহাই এখানে খাটবে না। মুদ্রাস্ফীতি সামলানোয় কী করা হয়েছে? বাংলাদেশে সরকার নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর ভারতের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শুল্ক-ভ্যাট বসিয়ে দাম বাড়ানোর বন্দোবস্ত করে রেখেছে। এভাবে সরকার আয় করে। এ আয়ের বড় অংশ যায় দুর্নীতিতে আর অস্বাভাবিক খরুচে উন্নয়নের খাই মেটাতে। এ আয়-ব্যয় হয় খেলাপিদের ঋণের বোঝা টানতে, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের পুষতে।
কেনা দামের ওপর অস্বাভাবিক লাভ ধরাই বাংলাদেশে রীতি। ওভার ইনভয়েসিংয়ের কায়দায় দুই দফায় লুট হয় সাধারণের পকেট। একবার বেশি আমদানি ব্যয় দেখিয়ে বাড়তিটা বিদেশে পাচারের মাধ্যমে, পরের দফায় সেই পাচারের খেসারতটা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে তুলে নিয়ে। ধনীদের আয় বাড়ানোর বহু কলাকৌশল রাষ্ট্রই করে রাখে। সে জন্যই কোটিপতি পয়দা করার দিক থেকে বাংলাদেশ বরাবরই বিশ্বের অন্যতম সেরা দেশ। সে জন্যই মহামারির মধ্যেও বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বাড়ে।
সাবেক কালে কেউ লাখপতি হলে বাড়িতে বাঁশের খুঁটির আগায় লাখের বাতি জ্বালাতেন। আধুনিক কালের বাংলাদেশি বিলিয়নিয়াররা শতকোটির মালিক হলে বিদেশে বাতি জ্বালান। হাজার কোটিপতি হলে তারাভরা শপিং মল, বিলাসবহুল হোটেল বা প্রাসাদ কেনেন স্বপ্নের বিদেশে। আগের নিয়ম থাকলে বাংলার আকাশ মিল্কিওয়ে ছায়াপথের মতো ঝলমল করত।






