ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আধিপত্য ঠেকানো

অস্ট্রেলিয়া একটি সমুদ্রবেষ্টিত দেশ। স্বভাবত নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য অন্য সমরাস্ত্র মতো সাবমেরিনও অতি গুরুত্বপূর্ণ তাদের কাছে। ফলে, সাবমেরিন নিয়ে ২০১৬ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে একটি চুক্তি হয় অস্ট্রেলিয়ার। দেশটির তখনকার প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল মহাসাড়ম্বরে এ চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। সেখানে ডিজেলচালিত ১২টি সাবমেরিন তৈরির জন্য প্রায় চার হাজার কোটি ডলারের চুক্তি হয়েছিল। ফ্রান্স পরবর্তীকালে প্রচলিত ডিজেলচালিত সাবমেরিন না বানিয়ে পারমাণবিক সাবমেরিন বানাতে বলেছিল, কিন্তু অস্ট্রেলিয়া রাজি হয়নি। ইস্যুটি ফ্রান্সের সঙ্গে ওই পর্যন্তই ছিল এত দিন। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ায় ২০২০ সালের শুরুতে করোনাভাইরাস। উৎকণ্ঠা-মহামারি-ট্রাম্প-চীন—সবকিছু মিলিয়ে দেশটি কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন অস্ট্রেলিয়া করোনাভাইরাসের উৎপত্তির স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানায় চীনকে। বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইঙ্গিতেই অস্ট্রেলিয়া ওই দাবি উত্থাপন করেছিল। আর এতে অস্ট্রেলিয়ার প্রতি চরম খেপে যায় চীন। চীনের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার একটি দারুণ বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের উৎপত্তি কৃত্রিম এবং এর জন্য চীনকে দায়ী করা হচ্ছে—তদন্তের আহ্বানকে এভাবেই দেখেছিল চীন। ফলে, ক্ষুব্ধ হয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের মাউথপিস’, ‘চীনের জুতায় লেগে থাকা চুইংগাম’সহ অনেক অসংলগ্ন মন্তব্য করে চীন। এখানেই না থেমে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলো একে একে বাতিলও করে চীন। রুদ্ধ করে পর্যটক–শিক্ষার্থীদের আসার পথ, হয়রানিও করে বিভিন্ন কূটনৈতিক ইস্যুতে। আবার বছরের একটি সময় বড়সড় সাইবার হামলা হয় অস্ট্রেলিয়ায়। সেটার জন্যও চীনের দিকেই আঙুল তোলে অস্ট্রেলিয়া।

সাধারণ নথিপত্রে চীনের ৫৯টি সক্রিয় এবং ১২টি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন রয়েছে। আর বৃহৎ যুদ্ধজাহাজ রয়েছে ১২১টি, যা চীনকে বিশ্বের তৃতীয় সর্ববৃহৎ নৌশক্তিতে পরিণত করেছে। সে তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার ডিজেলচালিত প্রচলিত কোলিন-ক্লাস মান্ধাতা আমলের সাবমেরিন আছে মাত্র ৬টি, যা ২০৩৬ সালে অকেজো হয়ে যাবে। আর দেশটির যুদ্ধজাহাজ আছে ৪৩টি। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগর এবং এতদঞ্চলীয় বিভিন্ন দ্বীপের পাশে প্রায়ই চীনের নৌবাহিনী মহড়া দিয়ে থাকে, যা আসলে অস্ট্রেলিয়ার নাকের ডগার ওপরই চলে। কখনো চীন ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় অনুপ্রবেশ করলেও দৃশ্যত কিছু করার থাকে না। কারণ, চীনকে নিজ সমুদ্র–অঞ্চলে অনুপ্রবেশে বাধা দেওয়ার সক্ষমতা অস্ট্রেলিয়ার নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ মহড়ায় অংশগ্রহণ করে থাকে অস্ট্রেলিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কয়েকটির সঙ্গে সম্পর্কও বৈরী। কারণ, এশিয়া–প্যাসিফিক দেশ হওয়ার পরও অস্ট্রেলিয়ার ভালোবাসা বরাবরই বেশি বিমানপথে ২১ ঘণ্টা দূরের ওয়াশিংটন আর ২৩ ঘণ্টা দূরের লন্ডনের জন্য। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তিনি বলেন, অস্ট্রেলিয়াকে নিজেদের সুরক্ষা আরও বাড়াতে হবে। ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পরপরই দেখা গেছে, সামরিক জোট কোয়াডে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে অস্ট্রেলিয়া। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার একটি জোট এই কোয়াড। যদিও ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাধীনতার জন্য তৈরি হয়েছিল জোটটি; তবে এখন কোয়াড হয়ে দাঁড়িয়েছে চীনবিরোধী একটি জোট।