ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের ২২তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের একটু বেশিই মন খারাপ হওয়ার কথা। এবার মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের দায়িত্ব ছিল তাঁদের কাঁধে। আয়োজক দলের অন্যতম সদস্য, অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের শিক্ষার্থী ফাইম ইসলাম জানালেন, মার্চের প্রথম সপ্তাহে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটা খসড়া পরিকল্পনাও সাজিয়ে ফেলেছিলেন তাঁরা, দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর প্রথম দিন থেকেই আমরা দিন গুনতে থাকি, কবে আমাদের ব্যাচ মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করবে। এবার সেই সুযোগ হলো না,’ বললেন ফাইম।
তবে ফেসবুকে ‘ইয়াং আর্টিস্ট নেটওয়ার্ক’ নামের একটি গ্রুপের মাধ্যমে দেশের সব চিত্রশিল্পীকে চলমান প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিল রেখে বৈশাখসংক্রান্ত ছবি আঁকার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। ফাইম বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এখান থেকে বাছাই করা ছবি নিয়ে চারুকলা প্রাঙ্গণে প্রদর্শনী আয়োজন করতে চাই আমরা।’
২০০৬ সাল থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করে আসছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা। চবির চারুকলা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক জিহান করিম জানান, মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে এবার জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরার পরিকল্পনা ছিল। হাতি, টেপাপুতুল, ঢোল, নৌকাসহ বিভিন্ন বড় কাঠামো বানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণসহ চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থানে রাখার কথা ভাবছিলেন। অধ্যাপক জিহান বলেন, ‘একটা বড় হাতি বানানোর কথা ছিল। সেই হাতির পেটে বিশাল একটি ছিদ্র থাকত, যেন সেখানে মানুষ প্লাস্টিকের বোতল ফেলতে পারে। বোতলে ভরে গেলে শিল্পকর্মটি একটা নতুন মাত্রা পেত।’ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কিনে কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এরই মধ্যে থেমে গেল সব আয়োজন।
সব প্রস্তুতি থেমে গেছে ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতেও। প্রতিবছর দায়িত্ব থাকে ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক সংগঠনের (এনএসইউএসএস) কাঁধে। এবারও আয়োজনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন ক্লাবের সদস্যরা। ক্লাবের সভাপতি ফারহান মোরশেদ বলেন, ‘অনেক বড় পরিসরে কাজ হয়, তাই অনেক সদস্যের দরকার হয় আমাদের। সে কথা মাথায় রেখে আমরা ক্লাবে নতুন সদস্য সংগ্রহ শুরু করেছিলাম। কিন্তু ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে গেল। এখন তো ঘরে থাকাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’ ফারহান জানালেন, ঘরে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়েই তাঁরা যতটা সম্ভব নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে চান। নিজ নিজ অবস্থান থেকেই নাচ, গান বা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ভিডিও দেবেন ফেসবুক-ইউটিউবে।
ছায়ানটের মতো করে সম্মিলিত কণ্ঠে বৈশাখের গান গাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিউপি) শিক্ষার্থীদের। বিইউপি কালচারাল ফোরামের সভাপতি সৈয়দ রাফাত বলেন, ‘বৈশাখ আর বসন্তবরণ—দুটি অনুষ্ঠানই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় আয়োজন।’ নববর্ষের পরিকল্পনা নাহয় না-ই হলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা ঠিকই করেছেন সংগঠনটির সদস্যরা। নিজেদের উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনে অনুদান দিয়েছেন তাঁরা।
শিক্ষার্থীদের সবার কথায়, নতুন বছরের জন্য উঠে এল একটাই প্রত্যাশা, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ সব ঠিক হয়ে গেলে নিশ্চয়ই আবার জমবে মেলা।






