সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিংয়ে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকা থেকে মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) বার্ষিক সম্মেলনের তৃতীয় পর্বের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রজ্ঞাপনেও এ তথ্য জানানো হয়।
শুভঙ্কর সাহা বলেন, এপিজির বার্ষিক সভায় বাংলাদেশকে নিয়ে তৃতীয় পর্বের চূড়ান্ত যে প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে, তাতে মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের নেয়া ভূমিকাকে সন্তোষজনক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রমের বিদ্যমান ব্যবস্থা পরীক্ষার জন্য এপিজি কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগো শহরে চলমান এপিজি বার্ষিক সভায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪১টি দেশের মানি লন্ডারিং রেটিং প্রদান করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার যে আশঙ্কা ছিল সেটি কেটে গেছে।
প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, বাংলাদেশের মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে নেয়া ব্যবস্থা পরিবীক্ষণের জন্য এপিজির ১৯তম বার্ষিক সভায় অনুমোদিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রম এপিজি ও এর সদস্য ৪১টি রাষ্ট্র কর্তৃক আন্তর্জাতিক মানের হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রদত্ত রেটিং অনুযায়ী ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন রিভিউ গ্রুপভুক্ত (আইসিআরজি) প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার যে আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা আর নেই।
এতে আরো বলা হয়, সন্ত্রাস, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, জঙ্গিবাদ, মুদ্রা পাচারসহ অন্য অপরাধ দমনে বাংলাদেশ সরকারের নেয়া পদক্ষেপ অ্যাসেসমেন্ট টিম কর্তৃক প্রস্তাবিত রেটিংগুলোর মধ্যে দুটি ইমিডিয়েট আউটকামের (আইও) রেটিংয়ে উন্নত হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকটি সদস্য দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক বাংলাদেশের ৪টি রেটিং কমানোর যে প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা সভায় বিবেচনায় নেয়া হয়নি। এর ফলে চূড়ান্ত পতিবেদন অনুযায়ী, মুদ্রা পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশ নরওয়ে ও শ্রীলঙ্কা থেকে ভালো অবস্থানে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক উন্নত দেশ থেকেও ভালো অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। এতে সন্ত্রাস, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, জঙ্গিবাদ, মুদ্রা পাচারসহ অন্য অপরাধ নির্মূলে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে।
উল্লেখ্য, ৫ থেকে ৮ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়াগো শহরে এপিজির বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
জানা গেছে, এই সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশে। কিন্তু গুলশান হামলার পর এপিজির বার্ষিক সভাটি ২ মাস পেছানো হয়। ঢাকার পরিবর্তে ভেন্যু করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।
জানা গেছে, জঙ্গি অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণ, অর্থ পাচার প্রতিরোধ এবং যে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অর্থায়ন বন্ধে প্রতিবছর এপিজির বার্ষিক সভা করা হয়ে থাকে। এবারের সভায় ৪১টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, ৮টি দেশ এবং ২৮টি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রায় ৪০০ প্রতিনিধি অংশ নেয়ার কথা ছিল। এই সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতিও ছিল।
প্রসঙ্গত, এপিজি হচ্ছে ‘অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন’ বিষয়ে মানদণ্ড নির্ধারণকারী এশিয়া অঞ্চলের সংস্থা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৪১টি দেশ এর সদস্য। এপিজি প্রতিনিধি দল সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিষয়ক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করে থাকে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশকে সংস্থাটি প্রথম মূল্যায়ন করে। এরপর বাংলাদেশ নিয়ে ২০০৮ সালে এ ধরনের মূল্যায়ন করা হয়েছিল। ওই সময়ে বাংলাদেশ সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমে খুব বেশি সফলতা দেখাতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশকে কালো তালিকার আগের ধাপ ‘ধূসর’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে নানা উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর সেখান থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসে। সর্বশেষ ২০১৫ সালের অক্টোবরে মূল্যায়ন করে গেছে এপিজি। ২০১৪ সালে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশকে ‘মুক্তি’ দেয়া হয়।
বাংলাদেশ ২০১৪ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি আইসিআরজি প্রক্রিয়া থেকে বের হয়ে এফএটিএফ পূর্ণভাবে বাস্তবায়নকারী দেশের তালিকাভুক্ত হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারতও এফএটিএফভুক্ত দেশ। প্রচলিত সাধারণ নিয়মে বিশ্বের কোনো দেশ আইসিআরজি প্রক্রিয়াভুক্ত থাকলে আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সেই দেশটির এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খরচ বেড়ে যায়। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।






