লোভনীয় অফার দিয়ে এই কাস্টমার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে

অন্যদিকে, ‘মানুষ সেখানে বিনিয়োগ করল কেন? আমরা কি তাদের বিনিয়োগ করতে বলেছি?’ এ ধরনের যুক্তিও জুতসই নয়। যে দেশের গণপরিবহনে এখনো লেখা থাকে ‘অপরিচিত লোকের দেওয়া কিছু খাবেন না’, যে দেশে এখনো ছেলেধরা সন্দেহে দিনদুপুরে মানুষ মেরে ফেলা হয়, সে দেশের মানুষ নিজেই বুঝে ফেলবে, ই-কমার্স সাইট বিনিয়োগের জন্য নয়, ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য—এটা খানিকটা বাহুল্য রকমের প্রত্যাশা। রাষ্ট্রের কোনো কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া মাসের পর মাস একাধিক প্রতিষ্ঠান যখন কইয়ের তেলে কই ভাজার মতো গ্রাহকের টাকা দিয়ে গ্রাহককেই বুঝ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সাধারণ মানুষের এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে— ই-কমার্স বুঝি ডিজিটাল দুনিয়ার নতুন এক চমক, নতুন এক উদ্ভাবন, যেখানে ক্রয়-বিক্রয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগও করা যায়।

এবার আসি সমাধানের প্রশ্নে। কারও ফ্লাইট ছিল রাত ১০টায়, তিনি যদি রাত ১১টায় বিমানবন্দরে পৌঁছে বলেন, সমাধান কী? এর কোনো সমাধান নেই। কারণ, বিমান ইতিমধ্যে ছেড়ে চলে গেছে। যেটি হতে পারে, সেটির নাম সমাধান নয়, সেটিকে ড্যামেজ কন্ট্রোল বা ক্ষতির পরিমাণ কমানো বলা যেতে পারে। ক্ষতি যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এখন ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, সেটি নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।

আমরা ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বা কমিটি গঠনের কথা জানতে পেরেছি।আমাদের ভাবনা অনুযায়ী ‘নিয়ন্ত্রণকারী’ না হয়ে ‘সমন্বয়কারী’ বা ‘উন্নয়নকারী’ জাতীয় শব্দ হলে ইতিবাচক শোনাবে। ই-কমার্স মশা কিংবা করোনাভাইরাস নয় যে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বরং ই-কমার্সের উন্নয়নের জন্য কর্তৃপক্ষ হতে পারে, যারা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করবে, যেখানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো সুষ্ঠুভাবে ই-কমার্স পরিচালনা করছে, তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা করা সহজ হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ড্যামেজ কন্ট্রোলের জন্য দুটি দিক নিয়ে কাজ করা যেতে পারে— ১. ইতিমধ্যে ‘ডুবে যাওয়া জাহাজ’গুলো, অর্থাৎ ইভ্যালির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে গ্রাহকদের যতটুকু সম্ভব অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা; এবং ২. ই-কমার্সের উন্নয়নের জন্য কর্তৃপক্ষ গঠনসহ একটি উন্নয়নমুখী স্ট্র্যাটেজি বা রোডম্যাপ গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।

প্রথমত, ইভ্যালির এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একেবারেই নতুন একটি অভিজ্ঞতা, যেহেতু ই-কমার্স সেক্টরের উত্থান এ দেশে নতুন। ফলে এর থেকে দ্রুত নিস্তার পেতে অত্যন্ত সাবধানে, সবার সহযোগিতায় একটি উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে হবে। ইভ্যালির ঘটনা চাউর হওয়ার পর থেকে বেশ কিছু মতামত বিভিন্ন মাধ্যমে এসেছে। মূলত দুটি সমাধানের কথা আলোচনায় এসেছে—১. আইনি পদ্ধতিতে ইভ্যালি অবসায়নের মাধ্যমে যা সম্পদ আছে তা বিক্রি করে পাওনাদারদের টাকা বুঝিয়ে দেওয়া; এবং ২. ইভ্যালির গ্রাহকদের পাওনা সব টাকা সরকার কর্তৃক পরিশোধ করা।
চলুন দেখে নিই কেন এই দুটি উপায়ের কোনোটিই বাস্তবতার নিরিখে সমাধান দিতে পারে না। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ইভ্যালির এই মুহূর্তে মোট দায় আছে ৫০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকা, অন্যদিকে সম্পদ আছে ১০০ কোটি টাকার মতো। এখন এই কোম্পানির অবসায়ন ঘটিয়ে এর সম্পদ বিক্রি করতে গেলে ‘ফায়ার সেল’ মূল্য ১০০ কোটি টাকা কখনোই পাওয়া যাবে না। এই সম্পদমূল্য অবচয় নির্ধারণের পরে কি না, সেটিও নিশ্চিত নই। ফলে সব বিবেচনায় হয়তো মোট সম্পদের সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ দাম পাওয়া যেতে পারে। যদি ৭০ কোটি টাকাও উদ্ধার করা যায়, তবে তা দিয়ে মোট দায়ের (১০০০ কোটির অনুপাতে) মাত্র ৭ শতাংশ পাওনা মেটানো সম্ভব হবে। অর্থাৎ এ প্রক্রিয়ায় ৯০ শতাংশের বেশি দায় পরিশোধ সম্ভব হবে না। যেখানে আমরা বুঝতেই পারছি, এই প্রক্রিয়ায় ৯০ শতাংশ বা তার বেশি দেনা পরিশোধ করা সম্ভব নয়, সেখানে আইনি পদ্ধতি প্রয়োগ করে অবসায়নের এই সুপারিশ আমাদের কাছে বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে হয়েছে।

দ্বিতীয় উপায় হিসেবে আলোচিত হয়েছে, সরকারের সব দেনা পরিশোধ করে দেওয়ার কথা। এখানে অনেক প্রশ্ন রয়েছে—কেন সরকার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এই বিপুল দেনা পরিশোধ করবে? লোভের ফাঁদে পা দেওয়া লোকজনকে রক্ষা করা সরকারের দায় কতটুকু? যদি ইভ্যালির ক্ষেত্রে করে, তাহলে অন্যগুলোর ক্ষেত্রে, যেমন ধামাকা কিংবা রিং আইডি, এসবের ক্ষেত্রে কী হবে? এভাবে বারবার নানা উপায়ে সুযোগ-সন্ধানী মানুষ লোভের বশবর্তী হওয়া সাধারণ মানুষকে ঠকাবে আর সরকার গিয়ে জনগণের হাজার কোটি টাকা খরচ করে তাদের উদ্ধার করবে, এ কেমন প্রস্তাব? তা ছাড়া যদি ই-কমার্স খাতে সরকার এই সুবিধা দেয়, তাহলে ডেসটিনি কিংবা যুবকের কী হবে?

এতসব প্রশ্নের ভিড়ে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে কোনোভাবেই জনগণের ট্যাক্সের টাকা এই খাতে সরকারের খরচ করা বাঞ্ছনীয় নয়। ধরে নিলাম সরকার ইভ্যালির ক্ষেত্রে এই বিশাল অঙ্কের জনগণের টাকা ব্যয় করে ইভ্যালির অবসায়ন ঘটাল। তাতে কিন্তু ইভ্যালির মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে একেবারেই শূন্যে মিলিয়ে দেওয়া হবে, যার ৪৫ লাখ গ্রাহক, কয়েক হাজার মার্চেন্ট এবং একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের অদৃশ্য সম্পদ রয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর যে কোনো দেশে, যে কোনো খাতের ব্যবসাতেই এত বড় একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা কঠিন এবং অবসায়নের মাধ্যমে এই পুরো নেটওয়ার্ককে আমরা ধ্বংস করে দিতে বলছি। এই সুপারিশ কতটুকু গ্রহণযোগ্য? ইভ্যালির দোষ খুঁজতে গিয়ে গুণের দিকগুলো বিবেচনায় না নিলে কী করে হবে। অনেকেই বলতে পারেন, নানা ধরনের লোভনীয় অফার দিয়ে এই কাস্টমার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা এত কিছুর পরে আর কাজে আসবে না। ইভ্যালির বর্তমান অবস্থা যা-ই হোক, ৪৫ লাখ সাধারণ মানুষের যে কাস্টমার বেজ, সেটা তো আর মুছে যায়নি। এই সংখ্যক গ্রাহককে ব্যবহার করে এক ক্লিকেই ৪৫ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।