বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের লোকসান

একসময় বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) অধীনে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান ছিল। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে তা কমতে কমতে এখন ৯টিতে এসে ঠেকেছে। এর মধ্যে ৭টি বহু বছর ধরেই লোকসানি। বাকি দুটি সামান্য লাভের মধ্যে থাকলেও বিদায়ী ২০২০ সালে করোনার ধাক্কায় বড় হোঁচট খেয়েছে। ফলে সব কটিই এখন ধুঁকছে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বর্তমানে বিএসইসির নামকাওয়াস্তে লাভে থাকা কোম্পানি দুটি হলো প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও গাজী ওয়্যারস লিমিটেড। অন্য সাত লোকসানি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে এটলাস বাংলাদেশ, ন্যাশনাল টিউবস, ইস্টার্ন টিউবস, ইস্টার্ন কেব্‌লস, জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি, বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি ও ঢাকা স্টিল ওয়ার্কস লিমিটেড।

বাংলাদেশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান (জাতীয়করণ) অধ্যাদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী ওই বছরের ১ জুলাই গঠিত হয় বাংলাদেশ ইস্পাত কারখানা করপোরেশন এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল ও জাহাজ নির্মাণ করপোরেশন। পরে ১৯৭৬ সালে সংস্থা দুটিকে একীভূত করে গঠন করা হয় বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি)। শুরুর দিকে সংস্থাটির অধীনে ৬২টি প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি স্থাপন করার ফলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৬৩।

বিএসইসির প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথম বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিতে শুরু করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর আমলে (১৯৭৬-৮১) ২২টি কোম্পানি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। এইচ এম এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময়ে (১৯৮২-৯০) বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয় আরও ১৮টি প্রতিষ্ঠান। এরপর খালেদা জিয়ার দুই দফায় (১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬) এবং শেখ হাসিনার প্রথম দফায় (১৯৯৬-২০০১) বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ করা হয়। এর মধ্যে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ বাইসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিজ, ২০০০ সালে মেটালেক্স করপোরেশন ও ২০০৪ সালে চিটাগাং স্টিল মিলস বেসরকারীকরণ হয়। এ ছাড়া সরকারি নির্দেশে অন্য সংস্থার অধীনে দেওয়া হয় কিছু প্রতিষ্ঠান। যেমন ২০০০ সালে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি পায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর ২০০৬ সালে ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস পায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে।

খানিক লাভের ক্ষণিক উঁকি

বিএসইসির অধীনে থাকা দুই লাভজনক কোম্পানির অন্যতম হলো প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, যদিও সরকারি গাড়ি কেনা হয় বলে এটি একটু লাভজনক বলে মনে করা হয়। গত পাঁচ বছরে, অর্থাৎ ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের মধ্যে কোম্পানিটির বিক্রি ৬৯৭ কোটি থেকে বেড়ে ৮৯৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। কিন্তু মুনাফা কমে ৯৪ কোটি থেকে ৬১ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। কোভিড-১৯-এর প্রভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে কোম্পানিটি মুনাফা করেছে মাত্র ৫৫ লাখ টাকা।

বিএসইসির আরেকটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান গাজী ওয়্যারস। ১৯৬৭ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে প্রায় চার একর জমির ওপর গড়ে ওঠে ১৭৯ জনবলবিশিষ্ট এই কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটি ইলেকট্রিক ট্রান্সফরমার ও মোটরস শিল্পের অন্যতম উপাদান সুপার এনামেল কপার ওয়্যার উৎপাদন করে। এর বার্ষিক সুপার এনামেল কপার ওয়্যার উৎপাদনক্ষমতা ৭০০ টন। পাঁচ বছর আগে কোম্পানিটি ৭৬ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করলেও সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে ৫৩ কোটি টাকায় নেমে গেছে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির মুনাফা ১৬ কোটি থেকে কমে মাত্র এক কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

আরেক কোম্পানি ন্যাশনাল টিউবস ১৯৬৪ সালে গাজীপুরের টঙ্গীতে ১৪ দশমিক ৩১ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির ৫১ শতাংশ শেয়ার বিএসইসির হাতে। অবশিষ্ট ৪৯ শতাংশ বেসরকারি মালিকানাধীন। এর জনবল ১৬৮। বার্ষিক ১০ হাজার টন জিআই/এপিআই পাইপ উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন এ কোম্পানি চার বছর ধরে লোকসান দেওয়ার পর সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৮ লাখ টাকা মুনাফার মুখ দেখেছিল। কিন্তু করোনার কারণে মুনাফা অর্জনের এই সুখ সয়নি প্রতিষ্ঠানটির। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৪ মাসে করোনার মধ্যে ৬৫ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে।

১৯৮০ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ১২৩ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয় জেনারেল ইলেকট্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (জেমকো)। বার্ষিক ১ হাজার ৮৭৫টি ট্রান্সফরমার উৎপাদনের ক্ষমতাসম্পন্ন এই কোম্পানির জনবল ১০০। চার বছর ধরে লোকসানে থাকা এই কোম্পানিও ২০১৯-২০ অর্থবছরে মুনাফার মুখ দেখতে পায়। মুনাফা হয় ৪ কোটি টাকা। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম চার মাসেও মুনাফা হয় প্রায় দুই কোটি টাকা।