২০১৯ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনে শামিল হওয়ার অপরাধে গত জুন থেকে এ পর্যন্ত তেহরান ও ইস্পাহানের ১১ জনকে ইরান সরকার ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালে দেশটির টেলিগ্রাম নামের একটি চ্যানেলে সরকারবিরোধী উসকানি দিয়েছেন বলে অভিযোগ এনে চ্যানেলটির সাংবাদিক রুহুল্লাহ জামকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে গত জুনে ইরানের সবচেয়ে বড় দারিদ্র্যবিরোধী এনজিও ইমাম আলী সোসাইটিকে ‘ইরানবিরোধী তৎপরতা চালানোর জন্য’ ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বন্ধ করে দিয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে হঠাৎ করে কেন ইরান তার দেশের সরকারবিরোধী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে এত মরিয়া হয়ে উঠেছে? এক কথায় এর জবাব হলো ‘ভয়’। এমনিতেই আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধ আবার চেপে বসায় দেশটির অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে আসছে। এর মধ্যে আবার করোনাভাইরাসের মহামারিতে ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠেছে। ফলে লোকজনের হাতে জীবন চালানোর মতো টাকাকড়ি নেই। তারা ফুঁসে উঠছে। এ ক্ষোভ যদি দমন করা না যায়, তাহলে পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে এবং তা সরকারের পতন ডেকে আনতে পারে। এ ভয় থেকেই সরকার জনগণের মধ্যে প্রাণের ভয় সঞ্চার করার চেষ্টা করছে।
ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। বায়ুদূষণ ও খরার প্রভাব ঠেকাতে দেশটি ব্যর্থ হয়েছে। এরপর কোভিড-১৯ মোকাবিলায় তারা যথার্থ ব্যবস্থা নিতে পারেনি বলেও জনগণের একটি বড় অংশ মনে করছে।
২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পরই ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ দিতে নতুন নতুন অবরোধ আরোপ করেছেন। এ ছাড়া করোনাভাইরাসের জের ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ভয়াবহভাবে পড়ে গেছে। এটি দেশটির অর্থনীতিতে টালমাটাল অবস্থা তৈরি করেছে। ২০১৮ সালে ইরানের তেল বিক্রি থেকে রাজস্ব এসেছিল ছয় হাজার কোটি ডলার, সেখানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০১৯ সালে দেশটির তেল রাজস্ব মাত্র ৯০০ কোটি ডলারে এসে ঠেকেছে। সরকার ভেবেছিল অন্য খাতগুলো থেকে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে ইরানের সামগ্রিক আয় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। ২০২০ সালের প্রথমার্ধে করোনাভাইরাসের কারণে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি ১৫ শতাংশ কমেছে এবং বছরের বাকি অংশে এ ধারা থেকে বের হওয়া যাবে বলেও মনে করছে না সরকার।
জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মূল্য রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। মূল্যস্ফীতি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ২০১৭ সাল থেকেই ইরানিরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য সরকারবিরোধী আন্দোলন করছে। সর্বশেষ গত বছরের নভেম্বর মাসে গ্যাসোলিনের দাম বাড়ার কারণে লোকজন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। এ আন্দোলন থামিয়ে দিতে সরকার কড়া ব্যবস্থা নেয় এবং প্রায় দেড় হাজার লোককে হত্যা করে।
গত বছরের সরকারবিরোধী আন্দোলন ও পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনা দেশটির রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে দুশ্চিন্তা তৈরি করে। গত ২৭ জুন উচ্চ পদাধিকারী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি আয়াতুল্লাহ সায়ীদ মোহাম্মাদ মুসাভি কোয়েনিহা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে একটি খোলা চিঠি লেখেন। তাতে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, একদিকে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া এবং অন্যদিকে করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের আয় কমে গেছে। তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার জোগাড় হয়েছে। এতে জনরোষ বাড়ছে এবং সেই জনরোষকে কাজে লাগিয়ে বাইরের শক্তি দেশের মানুষকে সরকারবিরোধী তৎপরতায় উসকানি দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতির কারণে সরকার এখন দুটি পথ বেছে নিয়েছে। প্রথমত, অতি দরিদ্রদের মধ্যে খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করছে এবং দ্বিতীয়ত, সরকারবিরোধীদের ওপর নির্যাতন বাড়িয়ে দিয়েছে।
গত এপ্রিলে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সংকটে পড়া বিক্ষুব্ধ মানুষকে থামাতে সরকার ইমাম হাসান হেডকোয়ার্টার নামের একটি কেন্দ্র খোলে। সেখান থেকে অতি দরিদ্রদের মধ্যে ‘আনুগত্যের বিনিময়ে’ নানা ধরনের সামগ্রী বিতরণ শুরু করে। তবে এটি যে বেশি দিন চালানো যাবে না, তা ইরান ভালো করে জানে। কারণ, দেশটির ৮ কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষই এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে এসেছে। এ বিপুলসংখ্যক মানুষকে এভাবে সহায়তা করা সম্ভব নয়। এ কারণে এখন ভীতিপ্রদর্শনই তার একমাত্র অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ফলে ভবিষ্যতে ইরান আরও অনেক বেশি কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠবে, তা চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়।






