করোনা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের তুলনায় পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো অনেক ভালো করছে। চীন থেকে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। যেহেতু পূর্ব এশিয়ার বেশির ভাগ দেশের সঙ্গে চীনের সীমান্ত লাগোয়া এবং চীনের সঙ্গে তাদের ব্যবসা–বাণিজ্য বেশি, সেহেতু পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়ে এই অঞ্চলের দেশগুলো চীনের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ। সেই সুবাদে এসব দেশে করোনার প্রকোপ বেশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের উচিত হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করোনা মোকাবিলায় পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে অনুসরণ করা।
কোভিড–১৯–এর বৈশ্বিক বিস্তার নিয়ে ৭ এপ্রিলের একটি সূচকে যা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য যেন দুই গ্রহের দুটি ভিন্ন এলাকা। দেখা যাচ্ছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রকে এই মহামারি একেবারে মুড়িয়ে ফেলেছে। ইউরোপ–আমেরিকায় প্রতি ১০ লাখ লোকের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮১৪ জন (যুক্তরাজ্যে) থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৩৬ জন (স্পেনে) আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যুর হার প্রতি ১০ লাখে ২৪ থেকে ৩০০ জন। অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ায় সংক্রমণের হার প্রতি ১০ লাখে ৩ জন (ভিয়েতনাম) থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৫৩ জন (সিঙ্গাপুরে)। সেখানে মৃত্যুর হার প্রতি ১০ লাখে ০ থেকে ৪ জন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, পশ্চিমের তুলনায় পূর্ব এশিয়ায় লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে অনেক কম।
তিনটি বিষয়ে ইউরোপ–আমেরিকার স্বাস্থ্য পরিস্থিতির সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার স্বাস্থ্য পরিস্থিতির তফাত আছে। প্রথমত, পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নতুন রোগের সংক্রমণ মোকাবিলায় পশ্চিমাদের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুতি নিয়েছিল। ২০০৩ সালে সার্স ভাইরাসের প্রকোপ এবং কয়েক বছর ধরে এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে ডেঙ্গু মহামারি হয়ে এসেছে। সে কারণে তাদের মধ্যে সচেতনতা বেশি ছিল। জানুয়ারিতে চীনে করোনা ধরা পড়ার পরপরই এসব দেশের নাগরিকেরা চীনে যাতায়াত কমিয়ে দিতে শুরু করে। এ ছাড়া তারা করোনায় আক্রান্ত সন্দেহভাজনদের পরীক্ষা করতে শুরু করে। চীন ও তার পাশের দেশগুলো পুরো পরিস্থিতি সামাল দিতে নতুন একটি ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করে। অন্যদিকে, পশ্চিমা দেশগুলোতে ভাইরাসটি আত্মপ্রকাশ করার পর প্রথম দিকে সেখানকার সরকারগুলো এটিকে পাত্তা দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিষেধক বিষয়ক সংস্থা (সিডিসি) জানুয়ারির ৩ তারিখে চীনের সিডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করে। ২০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসটির সংক্রমণ ধরা পড়লেও ৩১ জানুয়ারির আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনে যাতায়াত বন্ধের ঘোষণা দেননি। এমনকি তিনি চীনে ভ্রমণ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিলেও তা ঠিকমতো মানা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে রোগটি ধরা পড়া থেকে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আগপর্যন্ত চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৪ লাখ ৩০ হাজার লোক ঢুকেছে। এমনকি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও ৪০ হাজার লোক চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে।
পূর্ব এশিয়ার লোকেরা করোনা প্রতিরোধের প্রস্তুতির সময় থেকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণে এগিয়ে আছে। এই অঞ্চলের মানুষ সার্স ভাইরাসের সংক্রমণের সময়ও মুখে মাস্ক পরেছিল। এবারও প্রথম থেকেই মাস্ক পরছে। কিন্তু পশ্চিমা সরকারগুলো জনগণকে প্রথম দিকে মাস্ক পরতে বলেনি। এর অন্যতম কারণ, শুরুতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সরবরাহ করার মতো পর্যাপ্ত মাস্ক তাদের হাতে ছিল না। আরেকটি বড় কারণ হলো, মাস্ক দিয়ে যে সংক্রমণের গতি কমবে, তা কর্মকর্তারাই বুঝতে চাননি। অন্যদিকে, হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা ও পশ্চিমাদের তুলনায় খুব বেশি শুভেচ্ছা সূচক হাত না মেলানো—এসব এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনকার জীবনযাপনের অংশ। এসব দেশের কর্তৃপক্ষগুলো অফিস–আদালত ও অন্যান্য জনসমাগমস্থলে শনাক্তকরণ প্রথম দিকেই শুরু করেছে; অনেক বেসরকারি অফিসে কর্মীরা ঢোকার সময় তাদের গায়ের তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এয়ারপোর্ট ও ট্রেন স্টেশনের মতো ট্রানজিট হাবেও এ যন্ত্র থাকে। ইউরোপ–আমেরিকায় এখনো এ ধরনের চর্চা অনেক জায়গায় নেই।
উহানে ভাইরাসটি ধরা পড়ার পরই চীন গোটা শহরটিকে বন্ধ করে দেয়। কঠোরভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করতে না পারলে চীনকে আরও অনেক বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতো।






