বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের শিক্ষা

সামরিক সরকারের বর্ষপূর্তি
মিয়ানমারের সামরিক সরকার এক বছর পার করে ফেলল। পরিহাসের বিষয়, সামরিক সরকারকে আঞ্চলিক জোট ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো শুরুতে সাময়িক তিরস্কার ও ভর্ৎসনা জানালেও ক্রমশ তারাও মুখ না খোলার দলে নাম লিখিয়েছে। এক বছরে দেড় হাজার মানুষকে হত্যা ও সাড়ে ১১ হাজারের বেশি লোককে গ্রেপ্তারের করেছে সামরিক সরকার। সেই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের যেমন ২০১৬-১৭ সালে বাধ্য করা হয়েছিল নিজ দেশে ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে, তেমনি এ সরকার মিয়ানমারের থাই-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা কারেন ও কায়াহ থেকে প্রায় দুই লাখ জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক বাধ্য করেছে থাইল্যান্ড চলে যেতে। গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়া সত্ত্বেও মিয়ানমারের ভূরাজনৈতিক অবস্থানগত গুরুত্ব এবং এর প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়াসহ অনেক দেশ ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে স্বাভাবিকভাবে।

এক বছরের জরুরি অবস্থা শেষে তারা ‘অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। সেই নির্বাচন যখনই হোক আর তার ফল যা–ই হোক, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে যে তা কোনো কাজে আসবে না, সেটি সহজাত বুদ্ধি প্রয়োগে অনায়াসে বোঝা যায়। কিন্তু তাই বলে কি রোহিঙ্গা সংকটের বয়স কেবল বাড়তেই থাকবে আর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কেবল অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রহর গুনবে? এতে বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর হয়তো কিছু যায় আসে না, কিন্তু বাংলাদেশের?

সামরিক সরকারের শুরুর দিকে অনেকে আশার আলো দেখতে পেয়েছিলেন যে এবার বুঝি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। সামরিক সরকার হয়তো বিশ্বের কাছে নিজের বৈধতা অর্জনের জন্যই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজি হবে। সময় বলে দিয়েছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ছাড়াও সামরিক সরকার নিজ বৈধতা আদায় করে নিতে পারে। তবে কি বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বিকল্প ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের কথা ভাববে না?

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান কি কেবল প্রত্যাবাসনে?
বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশিসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার মানদণ্ডে বিশ্বের সর্বোচ্চস্থানে আসীন হয়েছে। প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার তথা—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা নিয়ে এ দেশে বসবাস করার সুযোগ দেওয়া তাই বাংলাদেশের জন্যই সবচেয়ে বেশি জুতসই কাজ। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ বিতর্কে মত্ত হবেন এই যুক্তিতে যে, রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার নিয়ে বাস করতে দেওয়া মানে মিয়ানমারে সংঘটিত গণহত্যাকে সমর্থন জানানো। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ তথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের বিচার আদায়ে ব্যর্থ হয়, তাহলেই সেটি হবে গণহত্যার প্রতি সমর্থন।

বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের শিক্ষা লাভ, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, কর্মদক্ষতা সৃষ্টি, কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারলে তা কেবল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নয়, বাংলাদেশের মানুষকেও নিরাপদে রাখবে। আর তারা অন্ধকারে বেড়ে উঠলে মাদক, পাচার ও সন্ত্রাসী কাজে সম্পৃক্ত হবে এবং তার প্রভাব অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিকদের ‍ওপর পড়বে। কারণ নগরে আগুন লাগলে দেবালয় এড়ায় না।

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান বলতে আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুঝে থাকি নিজ দেশে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়াকে। তাদের ফিরে যাওয়ার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ কী করবে, সেটি কদাচিৎ আলোচনায় আসে। আমাদের নিশ্চয়ই সেই বার্মিজ নাগরিকের মতো মুখ বন্ধ রাখার অবস্থা নয়?