‘ছাড়ে’ ছাত্রলীগে প্রার্থীর ছড়াছড়ি, বয়সে ‘বাধা’ ছাত্রদল

নিয়মিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের বাইরেও ভোটার-প্রার্থী থাকার সুযোগ দেওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে এখন প্রার্থীর ছড়াছড়ি। ভোট করতে বয়সের ব্যাপারে ছাড় দেওয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের প্রায় সবারই প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা আছে। কিন্তু বয়স্কদের হাতে বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্ব থাকায় শীর্ষ নেতারা কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।

আগামী ১১ মার্চ ডাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। ১৯ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে। ২৬ ফেব্রুয়ারি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময়। ইতিমধ্যেই ছাত্রসংগঠনগুলোয় প্যানেল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলীয় ও জোটগতভাবে এই আলোচনা চলছে। এর বাইরেও বিভিন্ন মহল থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। প্যানেল নিয়ে এই জল্পনাকল্পনা চলবে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। গড়াতে পারে আগামী ৩ মার্চ চূড়ান্ত প্রার্থীতালিকা প্রকাশ পর্যন্ত। এখন পর্যন্ত অন্তত ছয়টি প্যানেল হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও আলোচনায় বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

এবার হলভিত্তিক শিক্ষার্থীদের যে তালিকা করা হয়েছে, তাতে সাড়ে ৩৮ হাজার ভোটারের নাম ছিল। প্রার্থিতা ও ভোটার হওয়ার যোগ্যতা ‘শিথিল’ করার পর তা ৪৩ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৫ হাজারের বেশি।

নির্বাচন নিয়ে নানান হিসাব–নিকাশ আর সমীকরণে জমজমাট বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ।

নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ভোটার ও প্রার্থী করার পরিকল্পনা ভেস্তে যায় ছাত্রসংগঠনগুলোর বিরোধিতায়। গঠনতন্ত্র সংশোধন না হলে সব কটি সংগঠনেরই কেন্দ্রীয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ নেতারা নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়তেন। ক্রিয়াশীল নয়টি সংগঠনের ৩৬ জন নেতার মধ্যে মাত্র ১০ জন প্রার্থী হতে পারতেন। সংগঠনগুলোর দাবির মুখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত নেয়, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে স্নাতক করছেন বা করেছেন, এখন যেকোনো ধরনের কোর্সে ভর্তি আছেন বা এমফিল করছেন এবং বয়স ৩০-এর মধ্যে আছে, তাঁরা প্রার্থী হতে পারবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্তে বদলে গেছে দৃশ্যপট। প্রায় সব ছাত্রসংগঠনের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ছাড়া অন্য প্রায় সব সংগঠনের শীর্ষ নেতারা এই নিয়মের মধ্যে প্রার্থী হতে পারছেন। এরপর থেকেই আলোচনা—কারা নির্বাচন করছেন আর কারা করছেন না। বেশির ভাগ সংগঠন চাইছে জোটগত নির্বাচন করতে। ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের সঙ্গে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদভুক্ত সংগঠনগুলো আর বামপন্থী ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেদের প্রগতিশীল ছাত্র জোট থেকে নির্বাচনের পরিকল্পনা করছে। নিজেরা স্বতন্ত্রভাবে ভোট করার ঘোষণা দিলেও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের’ নেতাদের দলভুক্ত করার চেষ্টা করছে বাকি জোটগুলো। টিএসসিভিত্তিক সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও জোটভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। কয়েকটি সংগঠনের নেতারা নিজেরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চিন্তা করছেন। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে ইশা ছাত্র আন্দোলন শুরুতে কয়েক দিন আলোচনায় ছিল।

ছাত্রলীগের চার নেতাই প্রার্থী হতে পারবেন
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের চার শীর্ষ নেতাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী। কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ভর্তি হন ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে। সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিৎ চন্দ্র দাস ভর্তি হন ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষে, সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ভর্তি হন ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে।

নিয়মিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে নির্বাচন হলে সাদ্দাম হোসেন ছাড়া তিনজন বাদ পড়তেন। কিন্তু এখন সবাই প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটির দুই নেতা সহসভাপতি-সাধারণ সম্পাদক (ভিপি-জিএস) প্রার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা যেকোনো দুটি পদে প্রার্থী হতে পারেন। বর্তমানে ছাত্রলীগের এই চারজনের বাইরে কোনো পদধারী নেতা নেই। বাকি পদগুলোয় দলীয় পদ পেতে চাইলেও তা নির্ভর করছে এই চারজনের ওপর। অন্য পদগুলোয় নির্বাচন করার জন্য সদ্য সাবেক কমিটির বেশ কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে। হলগুলোয় সদ্য সাবেক হল কমিটির নেতাদের মধ্যে যাঁরা প্রার্থী হতে পারবেন, তাঁদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে রাখা হতে পারে।

ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ভিপি-জিএস পদ ছাড়া অন্যগুলোয় কারা প্রার্থী হতে পারেন, হলগুলোয় কাদের প্রার্থী করা হবে, সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। শীর্ষ পদগুলোয় কারা নির্বাচন করবেন, সেটা আপা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) ঠিক করবেন।’ পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের আগে আমরা যেভাবে কমিটি করেছিলাম, সে আলোকে ডাকসু নির্বাচন উপলক্ষেও আমরা কমিটি করব। সেখান থেকে বাছাই করে পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় কমিটি করা হবে।’

LEAVE A REPLY