ঐক্যের সময়

পৃথিবীর ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে সতর্কবাণীর প্রতি অনেকেই গা করেন না। খামখেয়ালি আচরণ করে থাকেন, প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো বাদে আশু মুনাফার দিকে বেশি গুরুত্ব দেন। সেগুলো প্রায় সময় ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে। পৃথিবীর অন্যতম ধনী বিল গেটস ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণ সম্পর্কে ২০১৫ সালে ভয়াবহভাবে বিশ্বকে সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আণবিক শক্তি বা অস্ত্র নয়, ভবিষ্যতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপদ আসবে ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার মাধ্যমে, যার পরিণতিতে ১০ মিলিয়ন মানুষ মারা পড়তে পারে। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন জ্যোতিষীদের মতো করে নয়, বিজ্ঞানমনস্কভাবে বিশ্বের অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে।

বিভিন্ন ভাইরাসের সঙ্গে সঙ্গে ইবোলার আক্রমণ তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন, ইবোলা দ্বারা ভয়াবহ মহামারি ছড়িয়ে পড়ার হাত থেকে পৃথিবী রক্ষা পেয়েছে কাকতালীয় কয়েকটি সুবিধাজনক কারণে। নতুন ভাইরাসের আক্রমণে ভবিষ্যতে তেমনটা না–ও ঘটতে পারে। কিন্তু বিশ্বনেতারা ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেননি, এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও নয়।

যখন চীনে গত ডিসেম্বরে করোনাভাইরাসের আক্রমণ শুরু হলো, চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তা সঙ্গে সঙ্গে অবগত করে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেটাকে নতুন একটা খবর ছাড়া খুব বেশি ভয়াবহ কিছু মনে করেনি। বিশ্বকে এ ব্যাপারে বা নতুন করোনাভাইরাসের মহামারি সম্পর্কে প্রথম দুই মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সেভাবে সতর্ক করেনি। বিশ্বের বহু রাষ্ট্রই এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদের অযোগ্যতা প্রমাণ করেছে।

বাংলাদেশ যথাসময়ে সতর্ক হতে পারেনি। কয়েকজন মনীষী বলেছেন, করোনার সঙ্গে লড়তে করোনার আগে হাঁটতে হবে, পেছনে নয়। কিন্তু সবাই করোনার পেছনে হেঁটেছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মহামারির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে সংক্রমণের হার বিভিন্ন বিপর্যস্ত দেশের চেয়ে বেশি। বিপদ শুধু করোনার আক্রমণ নয়, রয়েছে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা। করোনার আক্রমণে যখন স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রণালি ভেঙে পড়েছে, সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়বে। যদি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, তবে নানা রকম সংকট বাড়তেই থাকবে। সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ, বিদুৎ, পানি, গ্যাস, প্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ সচল রাখতে হবে। বিশেষ সেবা সচল রাখতে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই যেন সংক্রমণের শিকার না হয়, যেন সুরক্ষা পায়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশ অর্থনীতির ভিত্তি হচ্ছে কৃষি। সারা পৃথিবীর অর্থনীতির মূল হচ্ছে কৃষি বা খাদ্য। করোনার আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে যদি কৃষিকাজ বন্ধ থাকে, বাইরে থেকে কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী না আনা যায়, দ্বিতীয় ভয়াবহ বিপর্যয়টি শুরু হবে। প্রায় সব রাষ্ট্রে খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি থাকার আশঙ্কা রয়ে গেছে এবার। ফলে বাইরে থেকে খাদ্য কিনে ঘাটতি মেটানোর সুযোগ থাকবে না। ফলে বর্তমান বিপর্যয়ের মধ্যেই কৃষিকাজ বা চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে আগে যেমন কৃষকেরা বীজ উৎপাদন করতেন, এখন আর তা নয়। বীজ কিনে চাষাবাদ করা হয়। বীজ ঠিকমতো পাওয়া গেলে বিপদ আরও বাড়বে।

বিপদ যখন চরমে পৌঁছে যায়, তখন সবচেয়ে বেশি দরকার হয় মাথা ঠান্ডা রাখা। খুব সুচিন্তিতভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা করোনাভাইরাসের আক্রমণের শিকার হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। ফলে গ্রামগুলোকে যতটা সম্ভব এই আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। সবাই মিলে আতঙ্ক না ছড়িয়ে বাস্তবতা মেনে নিয়ে এগোতে হবে। সব বিপদে উদ্ধারের একটা না একটা পথ থাকবেই। সে জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার সমন্বিতভাবে এবং পুরো জাতির ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাওয়া। পুরোনো কাসুন্দি বাদ দিয়ে, রাজনৈতিক দলাদলি এড়িয়ে সামগ্রিকভাবে জাতি হিসেবে কাজ করা। পুরোনো রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে, ব্যক্তি আক্রমণকে পরিহার করে পথচলার জন্য দৃঢ় হওয়া।
সন্দেহ নেই, এ রকম সময়ে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দল–মত, ব্যক্তিগত পছন্দ বাদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা স্থাপন করতে হবে। যখন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষ হবে, তখন প্রধানমন্ত্রীসহ সবার সমালোচনা করা যাবে। বর্তমান সময়ে সবাইকে বিরাট চাপের মধ্য দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে, ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। সংকট উত্তরণে যোগ্য ব্যক্তিদের পরিকল্পনা নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কারও না কারও নেতৃত্বে সেটা করতে হবে। বাস্তবতার জমিতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যোগ্য ব্যক্তি। বর্তমান বিপর্যয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষার জন্য দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভরশীল হওয়া ছাড়া আর ভিন্ন কোনো পথ নেই। প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা করার জন্য সঙ্গে থাকতে হবে গণমাধ্যমগুলোকে। গণমাধ্যম এ সময়ে মানুষকে সাহস জোগানোর এক বিরাট শক্তি। বিশেষ করে দেশের গণমাধ্যমের প্রধান ব্যক্তিত্বরা পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করবেন।

নিশ্চয় ভুলে গেলে চলবে না, বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সবচেয়ে চাপ নিতে হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীকে। পাশাপাশি সত্যিটা হলো এই যে চিকিৎসকদের মতো মানসিক চাপ আমরা কেউ নিচ্ছি না। সবাই আমরা একটা ভয়াবহ যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছি। প্রধান কাজটাই হচ্ছে রাষ্ট্রের সব সামর্থ্য, সব সম্পদ এই লড়াইয়ে নিয়োজিত করা। লড়াইয়ের জায়গা প্রধানত তিনটি। যাতে রোগ না ছড়ায়, তার জন্য সব মানুষকে গৃহবন্দী করে রাখা। যারা গৃহবন্দী থাকবে, তাদের জন্য ন্যূনতম খাবার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয় লড়াইটা চিকিৎসা প্রদান। সেটার জন্য বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেবেন। দ্রুত সেখানে নতুন নতুন অস্থায়ী হাসপাতাল করতে হবে। বিভিন্ন ভবন যেগুলো এখন কাজে লাগছে না, অস্থায়ী হাসপাতাল হিসেবে সেগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। বিভিন্ন বিদ্যালয়কে কাজে লাগানো যেতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধে মেলাঘর হাসপাতালের অভিজ্ঞতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ অনেকের রয়েছে। খুব দ্রুত তখন তাঁরা নার্সদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। চিকিৎসকদের দায়িত্ব সেটা। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যতটা সম্ভব হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হবে, যেন তারা ঘরের ভেতর সংক্রমণ না ছড়ায়। সেখানে আর একটা বড় কাজ, টেলিভিশনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বোধগম্য ভাষায় করোনাভাইরাস সম্পর্কে বলা, সুরক্ষিত থাকার পথ দেখানো।

বাংলাদেশ একা এই বিপদ সামলে উঠতে পারবে না। কিন্তু ভিন্ন কোনো দেশের সাহায্য পাওয়া কঠিন এখন। কিন্তু তারপরও মনে হয়, দুটো দেশকে বাংলাদেশ হয়তো পাশে পাবে। দুটো দেশ হলো চীন আর জাপান। জাপান নিজে এখনো বেশ সুরক্ষিত। চীন চাইলে একাই বিরাট সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে বাংলাদেশের দিকে। বাংলাদেশকে সে জন্য দ্রুত সহযোগিতা চেয়ে এগিয়ে যেতে হবে। যারা আগে যাবে, আমার বিশ্বাস, তারাই তাদের সহযোগিতা লাভ করবে।