প্রেক্ষাপট ওয়ান-ইলেভেন: জেনারেল মইন

(ওয়ান ইলেভেনের প্রধান রূপকার তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ। ‘শান্তির স্বপ্নে সময়ের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থে জেনারেল মইন বর্ণনা করেছেন ওয়ান ইলেভেনের বিস্তারিত। ওই বইয়ের কিছু অংশ প্রকাশিত হলো মানবজমিন অনলাইন-এ)

মানবসৃষ্ট এক মহাদুর্যোগের আশঙ্কা যখন দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছিল, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির মুখোমুখি অবস্থানের কারণে দেশ যখন অবশ্যম্ভাবী এক গৃহযুদ্ধের কাছাকাছি উপনীত হয়েছিল তখন রাষ্ট্রই দেশরক্ষার একমাত্র উপায় হিসেবে ওয়ান-ইলেভেনের ঘটনাপুঞ্জের সূত্রপাত করে। ওয়ান-ইলেভেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুপরিকল্পিত কোন ঘটনা ছিল না। কোন গোষ্ঠী বা দলকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ কিংবা অধিষ্ঠিত করার জন্য ওয়ান-ইলেভেন মঞ্চস্থ হয়নি। ওয়ান-ইলেভেন ছিল দেশ ও জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় অসহায় জনগণের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। বিবর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্রের হৃত গৌরব ফিরিয়ে দিয়ে যথাযথ পথে একে পরিচালিত করার আন্তরিক এক প্রচেষ্টা থেকে ওয়ান-ইলেভেনের উত্থান। ওয়ান-ইলেভেনের কারণেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সৃদৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ।

ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপট আজ ইতিহাসের বিবেচ্য বিষয়। কী পরিস্থিতিতে, কী কারণে রাষ্ট্রকে ওয়ান-ইলেভেনের মতো অস্বাভাবিক এক কর্মপন্থা অবলম্বন করতে হয়েছিল সেসব বিচারের ভার আমি সময়ের ওপর ছেড়ে দিলাম। তারপরও একজন সচেতন নাগরিক ও একটি দেশপ্রেমিক সংগঠনের কর্ণধার হিসেবে এ সময়কার ঘটনাবলি আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করতো। এ সময়ের পত্রিকাগুলো অবলোকন করলে যে কেউ আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, দেশ তখন এক গভীর সংকটে নিপতিত ছিল। ওয়ান-ইলেভেনই হয়তো এ সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র বাস্তবসম্মত ও সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা ছিল। ভবিষ্যতের পাঠকের প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করেই আমি সময়কার ঘটনাবলির সারসংক্ষেপ তুলে ধরনে এই অধ্যায়ের অবতারণা করছি।
আমার মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণার মূলেই ত্রুটি ছিল। পৃথিবীর আর কোন দেশে এমন ব্যবস্থা প্রচলিত আছে কিনা আমার জানা নেই। আমাদের রাজনীতিবিদদের পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ ও নির্বাচনকে প্রভাবিত করার পূর্ব দৃষ্টান্ত এমন একটি অদ্ভুত ব্যবস্থার জন্ম দিতে বাধ্য করেছিল।
বিরোধী দল বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দাবি নিয়ে সোচ্চার হলেও অক্টোবর, ২০০৬ তারিখে এসে তাদের আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলো। চারদলীয় জোট সরকারের শেষদিন ছিল ২৮শে অক্টোবর। এ দিনটি যতোই এগিয়ে এলো আন্দোলন ততোই গতিময় হয়ে উঠলো। শুরু হলো হরতাল, অবরোধ আর একের পর এক আল্টিমেটাম। বিরোধী দলের দাবি তখন দুটি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে কেএম হাসানের বদলে অন্য কোন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে নির্বাচন করা এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন। চারদলীয় জোট দুটি দাবিই অগ্রহণযোগ্য বলে অগ্রাহ্য করায় দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করলো। অবশ্যম্ভাবী দুর্যোগের ঘনঘটার মুখে রাজনৈতিক ঐকমত্যে পৌঁছার জন্য ৫ অক্টোবর সংসদ ভবনে দুদলের মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপ শুরু হলো।
২৮ অক্টোবর, ২০০৬ তারিখে পুরো দেশ যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারাদেশই সেদিন বস্তুত অচল হয়ে পড়েছিলো। বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঝরে গিয়েছিল অনেকগুলো তাজা প্রাণ। শুধু রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে মানুষ এতো হিংস্র হতে পারে, নিজ চোখে না দেখলে তা বিশ্বাস করা কঠিন। প্রকাশ্য দিবালোকে বিভিন্ন চ্যানেলে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটলো। রাতে নির্মম এসব হত্যাকা-ের দৃশ্য টেলিভিশন পর্দায় দেখে আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। কেন এই অর্থহীন মৃত্যু? কোন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার এ হুঙ্কার। আমরা তো সবাই একই দেশের মানুষ। সবারই একদেশ, বাংলাদেশ।
৩ জানুয়ারি, ২০০৭ তারিখে হোটেল শেরাটনের জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে মহাজোট প্রেসিডেন্টের প্রধান উপদেষ্টার পদ আঁকড়ে থাকা, ভোটার লিস্টের ত্রুটি ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি বলে ২২ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না বলে ঘোষণা দেয়। তারা ৭/৮ জানুয়ারি সারাদেশে অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করে তাদের সকল প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়। ফলে এতদিন ধরে চলমান সমঝোতা প্রক্রিয়া এবং দেশকে বাঁচানোর যে চেষ্টা চলছিল তা এক মুহূর্তে ফিকে হয়ে যায়।

LEAVE A REPLY