স্বল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টি হয়েছে

আগামী ডিসেম্বরে ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা অনুষ্ঠানের ঘোষণা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। মাত্র ৬ মাস বাকি থাকলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা পায়নি শিক্ষাবোর্ডগুলো। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে চাপা ক্ষোভ ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টি হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সিলেবাস সম্পন্ন, টেস্ট পরীক্ষা, ফরম পূরণের পাশাপাশি বোর্ড কর্তৃপক্ষের নানা প্রস্তুতি শেষ করে পরীক্ষা গ্রহণ করা আদৌ সম্ভব কি না- তা নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন রয়েছে।সূত্রমতে, বিগত সময়ে ঘন ঘন কারিকুলাম, সিলেবাস ও পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তনে এমনিতেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এবার হঠাৎ করে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে আনা এ পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা আরো চাপে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া পর্যাপ্ত প্রস্তুতি সাপেক্ষে ডিসেম্বরে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়া হলেও একই মাসে আরেকটি পাবলিক পরীক্ষা (এইচএসসি) অনুষ্ঠান সম্ভব নয় বলে শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সেশনজট কমাতে ক্রমান্বয়ে সময় এগিয়ে একপর্যায়ে ডিসেম্বরে এসএসসি ও পরের মাসে এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণসহ দ্রুত একটি শিক্ষাসূচি ও পাবলিক পরীক্ষার স্থিতিশীল ও স্পষ্ট নীতি করার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানীরা।

সূত্রমতে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠনের পর নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ডিসেম্বরেই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণসহ শিক্ষাবর্ষ শেষ করার চিন্তার কথা জানান ড. এহছানুল হক মিলন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৫ এপ্রিল সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের জানান, ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা আগামী ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হবে। একইভাবে এইচএসসি পরীক্ষাও এগিয়ে আসবে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। তার এ ঘোষণার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে। যদিও এ পরীক্ষা কবে অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়ে-শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা বোর্ডগুলো থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খন্দোকার এহসানুল কবির গতকাল মঙ্গলবার আমার দেশকে জানান, ডিসেম্বরে এসএসসি পরীক্ষার বিষয়ে আমরা এখনো সরকারের কোনো নির্দেশনা পাইনি। আমাদের মতামতও চাওয়া হয়নি। মতামত চাওয়া হলে সব দিক বিবেচনা করেই আমরা মত দেব। তাছাড়া সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ীই আমরা প্রস্তুতি নেব।

এদিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এসএম কামাল উদ্দিন হায়দার আমার দেশকে বলেন, ডিসেম্বরে এসএসসি পরীক্ষার কোনো নির্দেশনা না পেলেও শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি। পরীক্ষার প্রস্তুতি বিষয়ে আগামী বুধবার একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানান তিনি। তবে একই মাসে তথা ডিসেম্বরে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান ঢাকা বোর্ডের শীর্ষ এ কর্মকর্তা।

ডিসেম্বরে দাখিল পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষও। এ বিষয়ে সরকারের কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় প্রস্তুতি শুরু হয়নি বলে জানান বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মিঞা মো. নূরুল হক।

গতকাল তিনি আমার দেশকে বলেন, সেশনজট কমাতে পরীক্ষা এগিয়ে আনতে শিক্ষামন্ত্রীর উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এটা একবারে না করে প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে আনলে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট সবাই সেভাবে প্রস্তুত হতে পারবে।

জানা গেছে, করোনা-পরবর্তী সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার অস্থিরতা, ঘন ঘন সিলেবাস পরিবর্তন এবং সর্বশেষ পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনার ঘোষণায় চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপে পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের অভিযোগ পরিকল্পনাহীন সিদ্ধান্তের কারণে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে।

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, এ চাপের প্রভাব পড়েছে কোচিং সেন্টারগুলোতেও। সেখানেও দ্রুত সিলেবাস শেষ করার তাগিদে বাড়তি ক্লাস নেওয়া হচ্ছে, ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর তৈরি হয়েছে দ্বিমুখী চাপ। স্কুল ও কোচিংয়ের অতিরিক্ত পড়াশোনায় তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বাড়তি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরাও।

রাজধানীর মিরপুরের একটি স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা অভিভাবক জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতে গত বছর নবব শ্রেণিতে পুরোনো কারিকুলামের বই চালু হয়। এ বছরের চলতি পাঁচ মাসে জাতীয় নির্বাচনি আমেজ, রোজা ও ঈদসহ নানা ছুটির কারণে খুব বেশিদিন ক্লাস হয়নি। এখন ডিসেম্বরে এসএসসি পরীক্ষার ঘোষণা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে তার সন্তান। এ বিষয়ে সরকারের দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো উচিত।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকাকালে করোনার কারণে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ ছিল। পরে নতুন সৃজনশীল সিলেবাস চালু হয়। সেখানে রান্না, সবজি কাটা, মাছ কাটা শেখানো হলেও মূল পড়াশোনায় আমরা পিছিয়ে পড়েছি।

একই উপজেলার আরেক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান জানায়, ক্লাস নাইনে ওঠার পর নতুন সিলেবাস পেলাম। আমরা কোনো একটি পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হতে পারিনি। এখন আবার পরীক্ষার সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পেয়েছি, যা আমাদের আরো চাপে ফেলেছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এতদিন তারা ২০২৭ সালের মার্চে এসএসসি পরীক্ষা হবে ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা আসায় তাদের পরিকল্পনা ভেঙে পড়েছে।

রাজশাহীর বায়া বাজারের শিক্ষার্থী মেহ্রুজ নাফিসা বলে, বছরের শুরুতেই যদি জানতাম ডিসেম্বরেই পরীক্ষা হবে, তাহলে সেভাবেই প্রস্তুতি নিতাম। এখন প্রায় ৯০ দিনের সময় কমে গেছে। এটা আমাদের জন্য বড় ক্ষতি।

সে আরো জানায়, আমরা ২০২৬ সালের প্রশ্নপত্রের ধরন অনুসরণ করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এখন সময় পাল্টে যাওয়ায় বুঝতে পারছি না কীভাবে প্রস্তুতি নেব। একই বছরে দুটি এসএসসি পরীক্ষা হবে কি না, সেটাও পরিষ্কার নয়।

কোচিং সেন্টারেও বাড়ছে চাপ

পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে কোচিং সেন্টারগুলোতেও। দ্রুত সিলেবাস শেষ করতে অনেক প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত ক্লাস নিচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা একদিকে স্কুল, অন্যদিকে কোচিংয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহীর একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

পরীক্ষার্থী নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে রাজশাহীর নওহাটা পৌরসভার বাসিন্দা লুৎফুন্নেছা বলেন, আমার মেয়ে সারাদিন দুশ্চিন্তায় থাকে। কবে পরীক্ষা হবে, কীভাবে প্রস্তুতি নেবে কিছুই বুঝতে পারছে না। কোচিংয়ের অতিরিক্ত ক্লাসেও স্বস্তি পাচ্ছে না। এতে তার মানসিক চাপ বাড়ছে, যা আমাদের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

শিশু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের অনিশ্চয়তা কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জিল্লুর রহমান বলেন, এ বয়সে শিক্ষার্থীদের জন্য স্থিরতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বারবার পরিবর্তনের কারণে তারা উদ্বিগ্ন, হতাশ ও আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চললে তা তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জামাল উদ্দিন বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে, তবে তা হতে হবে পরিকল্পিত ও ধাপে ধাপে। বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি ও সিলেবাস অনেক আগেই নির্ধারণ করা উচিত।