দাবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে দিয়ে আইবিএমের ডিপ ব্লু সুপারকম্পিউটার একসময় খুব হইচই ফেলে দিয়েছিল। অতিসম্প্রতি গুগলের ডিপ মাইন্ড কম্পিউটারের আলফাগো প্রোগ্রাম আরও একটি জটিল বোর্ড গেম গোর এক সেরা খেলোয়াড়কে হারিয়ে দিয়ে আবার সংবাদের শিরোনামে এসেছে। খেলার কথা বাদই দিলাম, এই যে আমরা গুগলে একটা ছবি দিয়ে কিছু সার্চ করছি, বাংলায় কিছু একটা লিখে সঙ্গে সঙ্গে তার ইংরেজি অনুবাদ পড়ে নিচ্ছি, অথবা আইফোনে সিরিকে ভয়েস কমান্ড দিচ্ছি, আবার ফেসবুকের পোস্টে পরিচিত লোকজনের ছবি অটোমেটিক ট্যাগ হয়ে যাচ্ছে—এই কাজগুলোর মধ্যে মিলটা কোথায় বলুন তো? এগুলোর জন্য প্রয়োজন বুদ্ধিমত্তা। মানুষের কাছে এই বুদ্ধিমত্তা সহজাত। আমরা যে একজন আরেকজনের মুখের ভাষা বুঝতে পারছি, তার জন্য কিন্তু আমাদের সেই ভাষা শিখতে হয়েছে। কিংবা কোনো একটা ছবি দেখে যখন চিনতে পারছি, সেটা কোনো এক সময় দেখে শিখেছি এবং মনে রেখেছি জিনিসটা কী। চিন্তা, চেতনা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মানুষের এই শেখা ও বুঝতে পারার প্রক্রিয়াকে বলা হয় কগনিটিভ প্রসেস। এর মূলে আছে আমাদের মস্তিষ্ক। সেই কগনিটিভ প্রসেসের কাজ যখন আমরা যন্ত্রকে দিয়ে করাচ্ছি, তখন তাকে বলছি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। পঞ্চাশের দশকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই ধারণার সূত্রপাত। কিন্তু কয়েক বছর আগ পর্যন্ত বাস্তব ক্ষেত্রে এর ব্যবহার তেমন একটা দেখিনি আমরা।
ইন্টারনেটের কল্যাণে আমাদের হাতে এখন প্রচুর পরিমাণ ডেটা। ডিজিটাল প্রসেস থেকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিটি কার্যকলাপ থেকে তৈরি হচ্ছে প্রচুর ছবি, টেক্সটসহ আরও কত রকমের ডেটা। ডেটার সহজলভ্যতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একেবারে শুরুর দিকের একটি অ্যালগরিদম হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক, যেটি মানুষের কগনিটিভ প্রসেসকে অনুকরণ করে বিদ্যমান ডেটা থেকে মডেল তৈরি করে। তারপর সেই মডেল অজানা ডেটার ওপর প্রয়োগ করে। ছবিকে চেনা (ইমেজ রিকগনিশন) বা টেক্সট প্রসেসিংয়ের জন্য এই ধরনের অ্যালগরিদম ব্যবহার করা যায়। যেমন ধরুন, অনেক পরিচিত ছবি থেকে মডেল তৈরির পর সেটি নতুন ছবি চিহ্নিত করার কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। নিউরাল নেটওয়ার্কে থাকে কয়েকটি লেয়ার, যার মধ্য দিয়ে ডেটার বিভিন্ন ফিচার প্রসেস হয়ে মডেলটি তৈরি হয়। এই মডেল তৈরির প্রক্রিয়াকে বলা হয় ট্রেনিং। এর জন্য প্রয়োজন বিশাল পরিমাণ ডেটা এবং জটিল কম্পিউটেশনাল অ্যালগরিদম। শুরুর দিকের নিউরাল নেটওয়ার্কে লেয়ার ছিল খুব সীমিত। কারণ, তখন ডেটা ছিল সীমিত। পাশাপাশি জটিল অ্যালগরিদম চালানোর মতো কম্পিউটার তত সহজলভ্য ছিল না। ছবিকে চেনার মতো কাজ সঠিকভাবে করতে প্রয়োজন অনেকগুলো লেয়ার। যেমন আমাদের মস্তিষ্কের ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স যেভাবে চোখে দেখার ব্যাপারটা প্রসেস করে—অপটিক্যাল সিগন্যাল থেকে নিউরনের বিভিন্ন লেয়ারে আকার, রং, গঠন বিন্যাস (টেক্সচার), ওরিয়েন্টেশন ইত্যাদি বিভিন্ন ফিচার প্রসেস হয়ে বস্তুটি চিহ্নিত হয়। আর দরকার প্রচুর পরিমাণ ট্রেনিং ডেটা। যত বেশি ডেটা দিয়ে ট্রেইন করা যাবে, মডেলের সঠিকভাবে কাজ করার সম্ভাব্যতা তত বাড়বে। সেই থেকে আবির্ভাব হলো ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্ক, যেটা ট্রেনিংয়ের জন্য প্রচুর ডেটাকে অনেকগুলো লেয়ারের মধ্য দিয়ে প্রসেস করে। ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মডেল তৈরির এ প্রক্রিয়া ডিপ লার্নিং নামে পরিচিত।
ডিপ লার্নিংয়ের জন্য ডেটা ও কম্পিউটিং পাওয়ার—দুটোই প্রয়োজন। বিগ ডেটার যুগে ডেটা তো এখন প্রতুল। আর সুপারকম্পিউটার ব্যবহার করে এই বিপুল ডেটার ওপর জটিল হিসাব নিকাশ করা সম্ভব। ২০১১ সাল, গুগল ব্রেইন ‘ক্যাট’ প্রজেক্টের কাজ মাত্র শেষ হয়েছে। ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে এটি ইউটিউবের ১০ মিলিয়ন ইমেজ থেকে শিখে সঠিকভাবে বিড়ালের ছবি চিনতে সক্ষম হয়েছে। এটা ডিপ লার্নিংয়ের এক অসামান্য কৃতিত্ব। কিন্তু এই কাজ শেষ করতে লেগেছে ২০০০ সিপিইউর সম্মিলিত কম্পিউটিং ক্ষমতার মেশিন! এ রকম বিশাল স্কেলের কম্পিউটার খুব কমই আছে। তাই প্রচলিত কম্পিউটার হার্ডওয়্যারের ওপর নির্ভর করে ডিপ লার্নিংয়ের এই বিশাল সম্ভাবনা পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করা সম্ভব নয়।




