বাজেট ঘোষণার পর করপোরেট কর আরও কমানো, ভ্যাট মামলায় জমা হ্রাস, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে কর কর্মকর্তাদের হানার ক্ষমতা বাদ দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবি করে আসছে ব্যবসায় সংগঠনগুলো। কিন্তু গতকাল সোমবার বাজেটের অর্থবিল পাস হওয়ার পর দেখা গেল, অর্থমন্ত্রীর মন গলেনি। তিনি ব্যবসায়ীদের দাবির বেশির ভাগই মানেননি। অর্থবিল সংশোধনের সময় করহার কমানো বা সুবিধা দেওয়ার পরিবর্তে শুল্ক-করের প্রশাসনিক পরিবর্তন বেশি করলেন তিনি।
২৭ জুন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে সংগঠনটির পক্ষ থেকে করপোরেট কর ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, শিল্পপণ্যে আগাম ভ্যাট শূন্য শতাংশে, অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ৩ শতাংশে আনাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব করা হয়েছিল। অর্থ বিল পাসের পর দেখা গেল, এফবিসিসিআইয়ের দাবিমতো এসব পরিবর্তন আনা হয়নি।
ফলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির ক্ষেত্রে করপোরেট কর কিছুটা কমলেও অন্য খাতে করপোরেট কর বহাল থাকল। করোনা পরিস্থিতিতে এমনিতেই ব্যবসা–বাণিজ্যে মন্দা। এ ছাড়া লাভ-ক্ষতিনির্বিশেষে ন্যূনতম কর দেওয়ার বিধানটি রেখে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এতে অগ্রিম কর খাতে ব্যবসায়ীদের খরচ আগের মতোই থাকল।
এ ছাড়া ভ্যাটের মামলা করতে গেলে ব্যবসায়ীকে দাবিকৃত অর্থের ২০ শতাংশ হারে অর্থ জমা দিয়ে কমিশনারেট পর্যায়ে প্রথমে আপিল মামলা দায়ের করতে হবে। সেখানে ন্যায়বিচার না পেয়ে ট্রাইব্যুনালে গেলেও ২০ শতাংশ হারে অর্থ জমা দিয়ে আপিল করতে হবে। এটাই ছিল অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাব। অর্থ বিলের সংশোধনীতে শুধু দ্বিতীয় ধাপে ২০ শতাংশ জমার বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের আসলে তেমন একটা লাভ হবে না। মামলায় গেলে আগের মতো প্রথম ধাপে ২০ শতাংশ অর্থ জমা রাখতে হবে।
নতুন ২০২০–২১ অর্থবছরের শুরুতে অর্থাৎ জুলাই মাস থেকে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতে উৎসে কর দশমিক ৫ শতাংশ আরোপ হচ্ছে। তৈরি পোশাক খাতের মালিকেরা বাজেট ঘোষণার দিনই পাঁচ বছরের জন্য উৎসে করহার আগের মতোই দশমিক ২৫ শতাংশ রাখার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সেটিও হয়নি।
সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ বাড়ানো হলো। এটি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোও এই শুল্ক ১৫ শতাংশ না করে আগের মতো ১০ শতাংশেই রাখার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু কাজ হয়নি। ফলে গ্রাহকদের বাড়তি খরচ করেই মোবাইল ফোনে কথা বলতে হবে। ১০০ টাকার রিচার্জ করলে ৭৫ টাকার টকটাইম বা সেবা পাবেন গ্রাহকেরা। আগে পাওয়া যেত ৭৮ টাকার টকটাইম।
জানতে চাইলে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, ‘করোনার কারণে সরকার বেশ চাপে আছে। স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। কারণ, প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করতে হবে। আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পূর্বাভাসও ভালো নয়। এমন অবস্থায় সরকার রাজস্ব আদায়ে বেপরোয়া। এর উদাহরণ, মোবাইল ফোন সেবায় সম্পূরক শুল্ক না কমানো। কিন্তু অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার করতে হলে ব্যবসাবান্ধব রাজস্বব্যবস্থা হতে হবে। এবার ব্যবসায়ীদের দাবিগুলোও তুলনামূলক বেশি যৌক্তিক ছিল।’
তিন সংগঠনের যৌথ বিবৃতি
অর্থনীতিতে করোনার প্রভাবের কারণে ভ্যাট ও আয়কর খাতে কিছু বাজেট প্রস্তাব বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে গতকাল যৌথ বিবৃতি দিয়েছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) এবং বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড)। এমসিসিআই সভাপতি নিহাদ কবির, ডিসিসিআই সভাপতি শামস মাহমুদ ও বিল্ডের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম খান এ বিবৃতি দেন।
যৌথ বিবৃতিতে তিন সংগঠন বলেছে, যেসব দাবি করা হয়েছিল, অর্থবিল পাস করার পর দেখা গেছে, বেশির ভাগ দাবি মানা হয়নি।
ভ্যাট অংশে আপিলের জন্য বাড়তি জরিমানা জমা রাখার প্রস্তাবটি বাদ দেওয়ার দাবি আংশিক পূরণ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, যখন ভ্যাট আরোপ অযৌক্তিক ও মাত্রাতিরিক্ত হবে, তখন নির্ধারিত হারে অর্থ জমা রেখে আপিল করা দুঃসাধ্য হবে, যা ন্যায়সংগত নয়। অনেক ক্ষেত্রে আইনানুগ যুক্তিসংগত ভ্যাট আরোপ না করে মাত্রাতিরিক্ত আরোপের পর এই ১০ শতাংশ বা ২০% জমার মাধ্যমে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের প্রবণতা দেখা যায়। এ ছাড়া উইথহোল্ডিং ট্যাক্স যৌক্তিক হারে কমিয়ে আনার দাবিও
মানা হয়নি।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির করপোরেট কর কমানোর সুফল উৎসে করের কারণে পাওয়া যাবে না। কেননা, আমদানি পর্যায়ে ও গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহকালে ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম কর দিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে তা ১০ শতাংশ হয়। উৎসে কর হিসেবে যত টাকা দিতে হবে, তা মুনাফার ওপর সাড়ে ৩২ শতাংশ করপোরেট করের কম হবে না। কিন্তু উৎসে করকেই ন্যূনতম কর হিসেবে ধরা হবে। উৎসে করের পরিমাণ সাড়ে ৩২ শতাংশ করপোরেট করের পরিমাণের নিচে রাখতে হলে নিট মুনাফার মার্জিন ২৫ শতাংশের বেশি হতে হবে, যা খুব কম ব্যবসায় হয়।
এ ছাড়া টার্নওভারের দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত অনুমোদনযোগ্য বিজ্ঞাপন ব্যয়ের ওপর বিধিনিষেধ বাতিলের দাবি জানিয়েছে ওই তিন সংগঠন।
অননুমোদিত তহবিলে গ্র্যাচুইটির টাকা রাখলে করযোগ্য হবে—এ বিধান বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অধিকাংশ কর্মীর ক্ষেত্রে এটি পুরো জীবনের সঞ্চয়। এভাবে কর্মীদের ওপর কর আরোপ করা অন্যায়।
সাধারণ মানুষ ও মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো মোবাইল সেবার ওপর থেকে বর্ধিত সম্পূরক শুল্ক কমানোর দাবি তুললেও সেটি শোনেননি অর্থমন্ত্রী। মোবাইল সেবার ওপর কর বাড়ার কারণে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষও ভুক্তভোগী হবেন। তাই অনেকেই আশা করেছিলেন অর্থ বিলে সংশোধনী এনে বর্ধিত সম্পূরক শুল্ক শেষ পর্যন্ত তুলে নেওয়া হবে। কিন্তু সেটি হয়নি।
জানতে চাইলে রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোবাইল সেবা ব্যবহারে সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ১৫ শতাংশ এবং টেলিযোগাযোগ খাতের ওপর আরোপিত ২ শতাংশ ন্যূনতম আয়কর বাজেটে প্রত্যাহার না হওয়াটা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিশেষ করে করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে দেশের মানুষকে ডিজিটাল সেবা প্রদান এবং ডিজিটাল ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরিতে অপারেটরদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পরেও এমন করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।’
সাহেদ আলম আরও বলেন, ‘আমরা আগের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কর বৃদ্ধি পেলে সাধারণ মানুষ ব্যবহার কমিয়ে খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি সমন্বয় করেন। সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর পরে গত কয়েক দিনে আমাদের আয় আরও ৪ থেকে ৫ থেকে শতাংশ কমেছে। সরকার হয়তো কর বাড়িয়ে স্বল্পমেয়াদি লাভ চাইছে। কিন্তু এটা না বাড়ালে বেশি সুফল পাওয়া যেত। মানুষ বাড়তি ব্যয় করত, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ত। এতে পরোক্ষভাবে সরকারের রাজস্ব বাড়ত।’






