বাবলাতলা পোনাবাজারে গিয়ে দেখা গেছে

যশোরে মাছের পোনা বিক্রয়কেন্দ্র নির্মাণের দেড় বছরেও সেটি সম্ভাব্য সুবিধাভোগীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। কর্তৃপক্ষ ২০ হাজার টাকা অফেরতযোগ্য জামানত নেওয়ায় প্রান্তিক বিক্রেতারা সেখানে জায়গা বরাদ্দ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেন্দ্রটি অব্যবহৃত থাকছে, মূল্যবান জিনিসপত্রও চুরি হচ্ছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দ্বিতল এই কেন্দ্রের নিচতলার ১১ হাজার বর্গফুট জায়গায় কার্পজাতীয় মাছের পোনা রেখে বিক্রির জন্য ৩২০ বর্গফুটের ৫১টি সিস্টার্ন (হাউস) নির্মাণ করা হয়েছে। সিস্টার্নে পানি শাওয়ারিং ও অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া দেশি প্রজাতির ছোট মাছের পোনা বিক্রির জন্য দোতলার ৭ হাজার ৯০০ বর্গফুটের জায়গা প্রস্তুত রয়েছে। সেখানে ৭০ জন ব্যবসায়ী বড় হাঁড়িপাতিল নিয়ে পোনা বিক্রি করতে পারবেন। মাছের গাড়ি সরাসরি দোতলায় নেওয়ার জন্য র‌্যাম্প পদ্ধতির সিঁড়ি করা হয়েছে। বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য রয়েছে স্বয়ংক্রিয় জেনারেটর।

যশোরে রেণু পোনার ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে বিক্রয়কেন্দ্রটি তৈরি করা হয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই কেন্দ্রে প্রান্তিক বিক্রেতাদের অনেকেরই জায়গা বরাদ্দ নিতে আগ্রহ কম। কেন্দ্রটির নিচতলায় ৫১ জনকে জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও আবেদন পড়েছে ৪২টি। দোতলায় ৭০ জনের বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও আবেদন পড়েছে ৪৪টি। এর মধ্যে প্রকৃত পোনা মাছের ব্যবসায়ী আছেন হাতে গোনা কয়েকজন। ফলে যে উদ্দেশ্যে কেন্দ্রটি স্থাপনা করা হয়েছে, তা ভেস্তে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট অনেকের।

জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, মাছের পোনা বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনাসংক্রান্ত সরকারি নির্দেশিকাতেই জায়গা বরাদ্দের জন্য প্রত্যেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা অফেরতযোগ্য জামানত ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাবদ বছরে ৬ হাজার টাকা নেওয়ার কথা বলা আছে। তিনি জানান, অফেরতযোগ্য জামানাতের পরিমাণ বেশি—এমন যুক্তিতে প্রান্তিক বিক্রেতারা যে জায়গা বরাদ্দ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

মনিহার ইসলাম নামের এক প্রান্তিক বিক্রেতা বলেন, ‘বাবলাতলায় হাঁড়িতে মাছ রেখে বিক্রি করতে আমাদের কোনো খরচ নেই। অথচ পোনা বিক্রয়কেন্দ্রে জায়গা বরাদ্দ নিতেই অফেরতযোগ্য ২০ হাজার টাকা জামানত দিতে হচ্ছে। আবার বছরে জায়গার ভাড়াও ৬ হাজার টাকা গুনতে হবে। এগুলো আমাদের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। তা ছাড়া পোনা মাছের মূল হাফা (পুকুর) হচ্ছে বাবলাতলা এলাকায়। তাই নতুন বিক্রয়কেন্দ্রে ব্যবসা কেমন হবে, তা বুঝতে পারছি না। এ জন্য জায়গা বরাদ্দ নিতে মন সায় দেয় না।’

স্থানীয় মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, যশোর শহরের চাঁচড়া এলাকা যেহেতু রেণু পোনা ও মাছ উৎপাদনের জন্য একটি সমৃদ্ধিশালী, সেহেতু এখানে ৮০ শতক জমির ওপর ১৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে উন্নত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন পোনা বিক্রয়কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছে। বৃহত্তর যশোর জেলা মৎস্য চাষ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত এই দ্বিতল কেন্দ্রে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর মৎস্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

সম্প্রতি বাবলাতলা পোনাবাজারে গিয়ে দেখা গেছে, রাস্তার ওপরে বড় বড় হাঁড়িপাতিলে মাছের পোনা রেখে বিক্রি করা হচ্ছে।

পোনা বিক্রয়কেন্দ্রটি দেড় বছরেও কেন চালু করা গেল না—এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, ‘লকডাউনের কারণে এত দিন কেন্দ্রটি চালু করতে পারিনি। তা ছাড়া ১২০ জন সুবিধাভোগীর মধ্যে জায়গা বরাদ্দ না দিয়ে শুরু করলে ব্যবস্থাপনা খরচ বেড়ে যেত। এতে ব্যবসায়ীদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আরও কিছু আবেদনের জন্য আমরা অপেক্ষা করছিলাম। শিগগিরই আমরা কেন্দ্রটি চালু করব।’

আনিছুর রহমান জানান, ইতিমধ্যে মৎস্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসন এবং সুবিধাভোগীদের প্রতিনিধির সমন্বয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারাই কেন্দ্রটি পরিচালনা করবে। তিনি আরও বলেন, সরকার বাবলাতলায় রাস্তার ওপরে পোনা বিক্রির বাজার না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই পোনা বিক্রির বাজার রাস্তা থেকে সরিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে বিক্রয়কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের এই বিক্রয়কেন্দ্রের দিকে আসতে হবে।

এদিকে পোনা বিক্রয়কেন্দ্রটি অব্যবহৃত পড়ে থাকায় এটি অরক্ষিতও। ফলে যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে।