বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থ সরকারি প্রকল্পে ব্যবহার

শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থ সরকারি প্রকল্পে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি করছে সরকার। এ নিয়ে নীতিমালা তৈরির কাজ করছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গতকাল বৃহস্পতিবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চ্যুয়াল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটের আগেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫ হাজার কোটি ডলার অতিক্রম করবে কয়েক বছরের মধ্যেই। এ রিজার্ভ দেশের বাইরে বিনিয়োগ করলে ১ বা ২ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি প্রকল্পে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের ব্যাপারে চিন্তা করছেন।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ। লেনদেনের ভারসাম্য প্রতিকূল হলে বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার দায় পরিশোধের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে রিজার্ভ। এটি কোনো দেশের বৈদেশিক দায় পরিশোধের অর্থনৈতিক সক্ষমতারও নির্দেশক।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের পর্যবেক্ষণে এসেছে, এশিয়ার কিছু উন্নত দেশে রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারের বেশি উদাহরণ রয়েছে। দেশগুলো হচ্ছে জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকং।

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২-এর ৭/অ ধারায় বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক বৈদেশিক মুদ্রার ধারণ ও ব্যবস্থাপনার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। বাংলাদেশ ব্যাংক একক কোনো মুদ্রায় না রেখে বিভিন্ন মুদ্রায় উচ্চমানের বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্বল্পমেয়াদি আমানতে বিনিয়োগ করছে। এ রিজার্ভ উচ্চমানের সার্বভৌম বা করপোরেট বন্ডেও বিনিয়োগ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রিজার্ভের একটি অংশ দিয়ে সোনাও কিনে রাখা হয়।

দেশের ইতিহাসে সেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন সর্বোচ্চ উচ্চতায়। পরিমাণ ৪ হাজার ২০৯ কোটি ডলার, যা গত এক বছর আগের তুলনায় এক হাজার কোটি ডলারের বেশি। বৈধ পথে দেশে প্রবাসী আয় পাঠাতে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে সরকার যে ২ শতাংশ প্রণোদনা দিয়ে আসছে, সে কারণেই প্রবাসী আয় আগের তুলনায় বেশি আসছে দেশে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) এসেছে দেশে। আগের অর্থবছরের তুলনায় তা প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বেশি। গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ২১১ কোটি ডলার।

রিজার্ভের অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা নিয়ে পাঁচ বছর ধরেই আলোচনা চলছে। নতুন করে আলোচনাটি ওঠে কোভিড-১৯ চলাকালীন এ বছরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৬ জুলাই অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সরকারি খাতের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ নেওয়া যায় কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ‘আমরা বিদেশ থেকে ডলারে ঋণ নিই। আমাদের যেহেতু ডলার আছে, সেহেতু নিজেদের ডলার থেকে নিজেরাই ঋণ নিতে পারি।’

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান পরে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী একটি ধারণা দিয়েছেন। আলোচনা-পর্যালোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ শেষে সিদ্ধান্তে আসা যাবে।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ একই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটি প্রতিবেদন জমা দিতে চিঠি পাঠায়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ বিভাগকে জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী কোনো প্রকল্পে রিজার্ভ ব্যবহারের সুযোগ নেই। তবে রিজার্ভের অর্থ ব্যবহার করা যেতে পারে, সে ক্ষেত্রে সরকারকে নিশ্চয়তাদানকারী (গ্যারান্টার) হতে হবে এবং রিজার্ভ থেকে মার্কিন ডলারে কেউ অর্থ নিলে মার্কিন ডলারেই তা ফেরত দিতে হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত রিজার্ভের অর্থ ব্যবহারের কৌশল ঠিক হয়নি। অথচ নীতিমালা জারি করার আগেই কেউ কেউ রিজার্ভ থেকে অর্থ চেয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকে আবেদন করে বসে আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্রগুলো জানায়, যত আবেদনই আসুক না কেন, ব্যক্তি খাতের কোনো প্রতিষ্ঠানকে রিজার্ভ থেকে অর্থ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া হবে না।