প্রণোদনার কৃষিঋণ বিতরণে ধীরগতি

কৃষি খাতের সব ধরনের ব্যাংকঋণের সুদহার কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। কম সুদের এ ঋণ নিতে আগ্রহী কৃষক ও কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা। তবে কম সুদে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না ব্যাংকগুলো। এ কারণে করোনার এই সময়ে এ খাতে ৫০০ কোটি টাকার ঋণও বিতরণ হয়নি।

করোনার এ সময়ে দেশে যাতে খাদ্যসংকট না হয় এবং চাষযোগ্য কোনো জমি যাতে অনাবাদি পড়ে না থাকে, সে জন্য সরকার কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকের জন্য ঘোষণা করা হয় পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল। এ ছাড়া শস্য ও খাতের সব ঋণের সুদের হার কৃষকের জন্য ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

এ প্রণোদনা তহবিল এবং সুদ কমানোর ঘোষণার তিন মাস অতিবাহিত হলেও এ সময়ে ব্যাংকগুলো এ খাতে মাত্র ৪৫৮ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। প্রণোদনা তহবিলের আওতা এবং তার বাইরে কম সুদের ঋণ হিসেবে এ অর্থ বিতরণ করা হয়। যার মধ্যে আবার ৩৩০ কোটি টাকা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক একাই বিতরণ করেছে। ফলে করোনায় ক্ষতি কাটাতে কৃষকদের সহায়তায় সরকার যে সুবিধা ঘোষণা করেছিল, সেটির বাস্তবায়ন হচ্ছে না। কৃষকের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলও তহবিলের প্রায় পুরোটাই এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে।

ব্যাংকগুলো বলছে, কৃষিঋণ বিতরণে খরচ অনেক বেশি। কারণ, ঋণের পরিমাণ থাকে কম। আবার প্রয়োজনীয় নথিপত্রে ঘাটতি থাকে অনেক সময়। এ ছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শাখা শহর পর্যায়ে, তাই ঋণ দেওয়ার মতো ভালো কৃষকও পাওয়া যায় না। তবে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কৃষি খাতে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর ইচ্ছার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে তারা বিভিন্ন অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে।

জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকগুলোর মধ্যে কৃষিঋণ নিয়ে একধরনের উদাসীনতা আছে। আবার নিজেরা না দিয়ে এনজিওর মাধ্যমেও দেওয়া হয়। এতে সুদহার অনেক বেশি পড়ে যায়।

ফসল উৎপাদনে কৃষককে উৎসাহ দিতে ও খাদ্যসংকট যাতে না হয়, সে জন্য কৃষি খাতে স্বল্প সুদের তহবিল গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে গত ১২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষি খাতের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি স্কিম বা তহবিল গঠন করবে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক তহবিলটি গঠন করে।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধান, গম, আলু, ভুট্টাসহ সব ধরনের শস্য ও ফসল উৎপাদনে ঋণের সুদহারও ৪ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়। ওই সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত কৃষক পর্যায়ে সব ধরনের ঋণের সুদহার হবে ৪ শতাংশ। আগে কৃষিঋণের সাধারণ সুদহার ছিল ৯ শতাংশ, এখন সেখানে ৫ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে কৃষকের সুদ কমে হয় ৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, কৃষি খাতের জন্য গঠিত ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত সব মিলিয়ে মাত্র ১৭২ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) বিতরণ করেছে ১১৬ কোটি টাকা ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) দিয়েছে ১০ কোটি টাকা। এর বাইরে বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংক ২০ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১৩ কোটি টাকা ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ২ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে প্রণোদনার আওতায়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী হোসেন প্রধানিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা কৃষিঋণ বিতরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কৃষকেরা যাতে চাহিদামতো ঋণ পান, এ জন্য সব শাখাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

এদিকে ধান, গম, আলু, ভুট্টাসহ সব ধরনের শস্য ও ফসল উৎপাদন খাতে এখন পর্যন্ত ২৮৬ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে বিকেবি দিয়েছে ২১৪ কোটি টাকা ও রাকাব দিয়েছে ৩৪ কোটি টাকা। এর বাইরে সোনালী ব্যাংক দিয়েছে ২৫ কোটি টাকা ও অগ্রণী ব্যাংক দিয়েছে ৪ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম সাজেদুর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, শাখা পর্যায়ে অনেকে করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় কৃষকেরাও এখন ভয়ে ব্যাংকে আসছেন না। আম্পান ও বন্যার কারণেও ঋণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জানা যায়, বেসরকারি খাতের কয়েকটি ও বিদেশি ব্যাংকগুলো বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর মাধ্যমে ঋণ বিতরণ করছে। এতে ঋণের সুদহার অনেক বেড়ে যাচ্ছে। তাই চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর তা বিক্রি করে তেমন মুনাফা করতে পারছেন না কৃষকেরা।