জাপানে করোনাভাইরাস সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তবে গত কয়েক দিনের হিসাবের আলোকে ধীর অগ্রগতি নিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এখন কিছুটা হলেও নিশ্চিত হতে পারছে। গতকাল মঙ্গলবার জাপানে নতুন ১২১টি সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়। সংক্রমণের দৈনিক এই হিসাব হচ্ছে এপ্রিল মাসের ৭ তারিখে জরুরি অবস্থা জারির পর থেকে সর্বনিম্ন। এ ছাড়া সারা দেশে গতকাল করোনাভাইরাসে ১০টি মৃত্যু তালিকাভুক্ত করে হয়েছে। এ নিয়ে জাপানে মোট মৃত্যুর সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে ৫৭৯।
পাশাপাশি জাপানে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সবচেয়ে বড় ক্লাস্টার বা গুচ্ছ টোকিওতেও ভাইরাসের ব্যাপকতায় লাগাম টানার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আজ বুধবার টোকিওতে নতুন সংক্রমণ শনাক্ত করা হয়েছে ৩৮টি। এ নিয়ে পরপর চার দিন জাপানের রাজধানীতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার দৈনিক হিসাব ১০০–এর নিচে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এই ধারাবাহিকতা হচ্ছে রোববার ৮৭টি সংক্রমণ চিহ্নিত হওয়ার পর থেকে ক্রমাগত পতন। তবে এই অগ্রগতি সত্ত্বেও টোকিওর গভর্নর ইয়ুরিকো কোইকে বলেছেন, গোল্ডেন উইকের দীর্ঘ ছুটি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রকৃত অগ্রগতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
অন্যদিকে পরিসংখ্যানগত এসব হিসাব–নিকাশ থেকে জাপানে ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আনার সংগ্রামে ধীর অগ্রগতির আভাস পাওয়ার মুখে কর্তৃপক্ষ এখনো সাবধানতা অবলম্বন করায় ঢিলেমি নিয়ে সতর্ক করে দিচ্ছে নাগরিকদের। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার প্রয়োজনীয়তা জাপান সরকার ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার সময় থেকেই বলে আসছিল। সামাজিক দূরত্বের মধ্যে আছে ভিড়ের যানবাহন ও এলাকাগুলো এড়িয়ে যাওয়া। জনসমাবেশ যেখানে ঘটে, সে রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন না করা। অফিস কিংবা দোকানপাটে একে অন্যের কাছাকাছি না এসে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা। এর বাইরে মাস্ক পরা, নিয়মিতভাবে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নেওয়া, বাইরে থেকে ফিরে এসে পরিধানের পোশাক বদল করে নেওয়া এবং জীবাণুনাশক দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নেওয়ার পরামর্শ আগে থেকেই দেওয়া হচ্ছে।
জাপান সরকারের বিশেষজ্ঞ প্যানেল এখন এসব পদক্ষেপ গ্রহণের বাইরে নতুন জীবনধারা অনুসরণের আহ্বান নাগরিকদের প্রতি জানাচ্ছে। এই নতুন জীবনধারার অংশ হিসেবে প্যানেল এখন এসব পদক্ষেপের বাইরে নাগরিকদের জন্য অতিরিক্ত আরও কিছু করণীয় যোগ করে নিয়েছে, যার মধ্যে আছে; প্রতিদিন সকালে দেহের তাপমাত্রা নেওয়া, পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল না থাকা বন্ধ ভিড়ের জায়গা এড়িয়ে যাওয়ার সরকারি উপদেশ মেনে চলা, এবং বাড়িতে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যবহার শুধু কাজের জন্যই নয়, একই সঙ্গে খেলাধুলা ও অন্যান্য বিনোদন উপভোগের জন্যও ব্যবহার করা। এ ছাড়া খাবার টেবিলে বসার নতুন ব্যবস্থাপনার দিকটিও প্যানেল নাগরিকদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ভাইরাস যেহেতু সংক্রমিত ব্যক্তি কথা বলার সময় নিশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া অণু-কণার মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সংক্রমণ যেহেতু অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে এর উপস্থিতির জানান দেয় না, তাই একসঙ্গে কারও সঙ্গে খেতে বসলে যা করতে হবে তা হলো, মুখোমুখি না বসে বরং পাশাপাশি বসা অবস্থায় আহার সেরে নেওয়া এবং কথাবার্তা কম বলা।
প্যানেলের দেওয়া আরও কিছু পরামর্শের মধ্যে আছে, অন্য জেলায় দেশের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া থেকে বিরত থাকা, সার্বিকভাবে ভ্রমণ না করা, বাড়ি ফিরে আসার পরপর গোসল সেরে নেওয়া এবং বাস কিংবা ট্রেনে যাতায়াত করার সময় কথা বলা থেকে বিরত থাকা।
প্যানেলের একজন সদস্য সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, এসব পদক্ষেপের সার্বিক বাস্তবায়ন হচ্ছে করোনাভাইরাসের টিকা কিংবা ওষুধ না থাকা অবস্থায় সংক্রমণের আরও বিস্তার প্রতিরোধ করার একমাত্র কার্যকর উপায়। তবে নতুন এই জীবনধারা নিয়ে নাগরিক প্রতিক্রিয়া জাপানে খুব একটা ইতিবাচক নয়। অনেকেই এটাকে ব্যক্তিজীবনের ওপর অযথা হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন এবং সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের সেই অসন্তোষ তুলে ধরছেন। অন্যরা আবার এর সমর্থনে বক্তব্য রেখে বলছেন, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মানুষের জীবন বাঁচাতে হলে এর বিকল্প নেই।
অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে
এদিকে করোনা-পরবর্তী সময়ে জাপানের অর্থনীতির অবস্থা কী রকম দাঁড়াতে পারে, তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণ একদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকাংশে স্থবির করে দিলেও সরকারের ব্যয় তা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়। মূলত প্রণোদনা পদক্ষেপ ও ক্ষতিগ্রস্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে সহায়তার লক্ষ্যে নেওয়া আরও কতিপয় সিদ্ধান্ত সরকারের নিয়মিত ব্যয়ের বোঝা আকাশচুম্বী করে তোলায় অর্থনীতির অবস্থা শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা নিয়ে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে গবেষকদের মধ্যে।
বিএনপি প্যারিবাস সিকিউরিটিজ জাপানের প্রধান অর্থনীতিবিদ রিউতারো কোনো পূর্বাভাস দিয়েছেন যে করোনাভাইরাস মহামারি সামাল দেওয়ার লক্ষ্যে জারি করা জরুরি অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এপ্রিল-জুন ত্রৈমাসিকে জাপানের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ৩৩ শতাংশ সংকুচিত হবে। তিনি আরও বলেছেন, চলমান স্বাস্থ্যসংকট অব্যাহত থাকা অবস্থায় ভোক্তা ব্যয় তা বড় সময়ের জন্য নিচের দিকে ঠেলে দেবে এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে পুঁজি বিনিয়োগ হ্রাসে বাধ্য করবে। ফলে এর চূড়ান্ত ফলাফল হবে আরও অনেক বেশি ক্ষতিকর।
জরুরি অবস্থা চলা অবস্থায় জাপানের অধিকাংশ ডিপার্টমেন্ট স্টোর খাদ্য বিক্রির অংশ বাদ দিয়ে অন্যান্য সব অংশ বন্ধ রাখছে। ফলে এদের বিক্রি এপ্রিল মাসে সার্বিকভাবে কমেছে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে এপ্রিল মাসে মোটরগাড়ির বিক্রি কমেছে বছরওয়ারি হিসাবে ২৮.৬ শতাংশ। তবে বড় আকারের কোম্পানির বেলায় অবস্থা কঠিন হলেও ক্ষুদ্র কিংবা মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানের মতো গভীর সংকটাপন্ন তা নয়।
জাপানের প্রধান শহরগুলোর অধিকাংশ রেস্তোরাঁ, ক্যাফে এবং বার মাসাধিককাল ধরে বন্ধ আছে। অন্যদিকে যেগুলো চালু আছে, সেগুলোতেও মক্কেলের ভিড় একেবারে তলানিতে। দাই-ইচি লাইফ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান অর্থনীতিবিদ হিদেও কুমানো এই পরিস্থিতিকে একজন ডুবন্ত মানুষের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ডুবতে থাকা অবস্থায় প্রথম ৩০ সেকেন্ডের চাইতে পরের ৩০ সেকেন্ড যেমন আরও অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে, একইভাবে জাপানের অর্থনীতি এখন প্রথম ৩০ সেকেন্ডের অবস্থায় আছে ধরে নিয়ে তিনি বলছেন, পরের এক মাস দেশের অর্থনীতির জন্য আরও বেশি কঠিন সময় হয়ে উঠবে।






