নগরের খেটে খাওয়া মানুষের আয় কমেছিল ৮০ শতাংশ

রাজধানীর মধুবাগে আসবাব আনা-নেওয়ার কাজ করেন ফজলু মিঞা। করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ভালোই চলছিল সব। দিনে উপার্জন হতো প্রায় হাজার টাকা। গত বছরের জুলাই-আগস্ট মাসে তাঁর আয় কমে ২০০-৩০০ টাকায় নেমে এসেছিল, যদিও এখন তা ৫০০-৬০০ টাকায় উঠেছে।

স্ত্রী-সন্তানকে গত বছর সাধারণ ছুটির সময়ই বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ফজলু মিঞা। এখনো তারা বাড়িতেই। কিন্তু বাড়িভাড়ার হাত থেকে রেহাই নেই। সাড়ে চার হাজার টাকা ভাড়া দিতে তিনি এখন হিমশিম খান। বাড়িওয়ালাকে তিন মাসের বকেয়া ভাড়া ভেঙে ভেঙে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু বাড়িওয়ালা রাজি না হওয়ায় শেষমেশ উপার্জনের একমাত্র সম্বল ভ্যানগাড়িটি বিক্রি করে বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করেছিলেন। অবশ্য পরে আবার একটি ভ্যানগাড়ি কিনেছেন।

মধুবাগ মাঠের সামনে সন্ধ্যায় ভেলপুরি বিক্রি করেন মো. আরজু। সকালে বিক্রি করেন পার্শ্ববর্তী একটি স্কুলের সামনে। কোভিডের আগে দিনে দুই বেলায় আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা বিক্রি হতো তাঁর। তাতে হাজার-বারো শ টাকার মতো লাভ হতো। কিন্তু করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। গ্রামে চলে যান। ঢাকায় থাকেন বলে গ্রামের নেতারা সরকারি ত্রাণ দিতে গড়িমসি করেন। বলা বাহুল্য, এ সময় জমা টাকা খরচ করতে হয়েছে। তাই সে পথে আর হাঁটেননি। আড়াই মাস গ্রামে কাটিয়ে গত বছর ঈদুল ফিতরের পর আবার ঢাকায় ফেরেন তিনি। এখন সারা দিন অনেক চেষ্টা করে ৩০০-৪০০ টাকার মতো থাকছে। কিন্তু ঘরভাড়া তো কমেনি। অন্যান্য খরচও হয় আগের মতো, নয়তো বেড়েছে।

বেতন বা মজুরির বিনিময়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে ৬২ শতাংশ কর্মী বা শ্রমিক বলেছেন, ২০২০ সালের মার্চ-ডিসেম্বর সময়ে তাঁদের মজুরি বা বেতন ২০১৯ সালের তুলনায় কমেছে। আর এ সময়ে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ শ্রমিক-কর্মী কাজ হারিয়েছেন। পুরুষের তুলনায় নারীরা বেশি কাজ হারিয়েছেন। কর্মসংস্থান ও অভিবাসনে কোভিড-১৯-এর প্রভাব নিরূপণে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এর আগে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে নগরের খেটে খাওয়া মানুষের আয় কমেছিল ৮০ শতাংশ। সে তুলনায় গ্রামীণ খেটে খাওয়া মানুষ তুলনামূলকভাবে ভালো আছেন, তাঁদের আয় কমেছে ২০ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে দেশে ১ কোটি ৬৪ লাখ নতুন দরিদ্র সৃষ্টি হয়েছে বলে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি জানায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা জরিপ অনুসারে ২০১৬ সালে দেশের গ্রামাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্য ছিল ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৮ সালের জিইডি-সানেম জরিপ অনুসারে, এ হার ছিল ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু করোনার প্রভাবে ২০২০ সালে গ্রামে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ৩ শতাংশে। অন্যদিকে শহরাঞ্চলে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। করোনার কারণে ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

ফজলু মিঞা এখন প্রায় সারা দিনই মধুবাগ পুলিশ ফাঁড়ির পাশে বসে থাকেন কাজ পাওয়ার অপেক্ষায়, অথচ আগে তাঁকে খুঁজে পাওয়াই ছিল ভার। দিনের বেশির ভাগ সময়ই ভ্যানের ওপর পা ছড়িয়ে বসে থাকেন, নাহয় সহকর্মীদের সঙ্গে গল্পগুজব করেন, তাস-লুডু খেলেন।